মন্ত্রী, নেতাদের অতিকথন এবং সুন্দরী মহিলার স্কার্ট

0
529

বেশি কথা বলা বা ‘অতিকথন’ হল ডাক্তারি ভাষায় একটি রোগের মতো। ভারতীয় উপমহাদেশে এই অতিকথন আমরা দেখে আসছি সেই আদ্দি কাল থেকেই। সাহিত্যে অতিকথন অলংকার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আবার প্রাচীণ ও মধ্য যুগের নাটক বা যাত্রায় কোন অভিনেতা তার ডায়ালগ ভুলে গেলে সহ-অভিনেতা অতিকথনের মাধ্যমে তা কভার করে নিতেন, তা আমরা দেখেছি। কিন্তু এই অতিকথন এখন সমাজে বিভিন্ন পেশাজীবীদের মাঝে এমন মাত্রায় ছড়িয়েছে যে, তা মাঝে মাঝে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যারপরণায় বেকায়দায় ফেলে দেয়।

আমাদের মধ্যযুগের পুঁথি সাহিত্যে দেখেছি যে, সেখানে পুথিকারগন অতিকথনের আশ্রয় নিয়েছে তার বাক্য শ্রুতি মধুর করে পাঠক শ্রোতাকে আকৃষ্ট করতে। যেমন,

“লাখে লাখে কাটে মর্দ, বলে মার মার,

গুনিয়া সুমার করে চল্লিশ হাজার।“

কিংবা

“ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ হাঁটিয়া চলিল,

তিন মাসের পথ মর্দ তিন দিনে গেলো।”

সাহিত্যের অতিকথনের এমন হাজার হাজার উদাহরণ দেয়া যায়। কিন্তু আমি আজ বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও মন্ত্রীদের অতিকথনের কিছু উদাহরণ তুলে ধরতে চাই।

কিছুদিন আগে দেশের সাংবিধানিক সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদুক) এর প্রধানের একটি বক্তব্য মিডিয়ায় ট্রল হয়। তিনি যা বলতে চেয়েছিলেন, তাঁকে বিকৃত করার সুযোগ তৈরি হয় দুদুকের অন্যান্য কর্তাদের অতিকথনের জন্য, অনেকেই তা বিশ্বাস করে পরে ভুল বুঝতে পারেন। দেশে কোথাও কোন জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হলে কিছু পুলিশ সদস্য এমন কিছু অতিকথন করে বসেন যে, কয়েক মিনিটের মধ্যে অপরাধীকে ধরে তার শাস্তি কার্যকর করা হয়ে যাবে। আসলে অপরাধীকে আটকিয়ে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন সহ আদালতে সোপর্দ করা পুলিশের কাজ, বিচার করা তার কাজ নয়। এমন অনেক মামলা আছে যার তদন্ত কাজ ১০ বছরেও পুলিশ শেষ করতে পারেন নি, তবুও কিছু অতি উৎসাহী পুলিশ সদস্যের অতিকথনে পুলিশ সদস্যদের ইমেজ সংকটে ফেলেছে। একজন নষ্ট ট্রাফিক পুলিশ কনস্টেবলের ২০ টাকার চাঁদাকে নির্মাণ তদারকের দায়িত্বে থাকা নষ্ট প্রকৌশলী ও তাদের বস, আমলা, কৃষিবিদ, পশুসম্পদ কর্মকর্তা বা ডাক্তারদের কোটি কোটি টাকার পারসেন্টেজের চেয়ে বড় করে দেখা হয়। কারণ নষ্ট প্রকৌশলী, আমলা, কৃষিবিদ, পশুসম্পদ কর্মকর্তা বা ডাক্তারগণ নেংটি ইঁদুরের মত খুব ধীরে ধীরে মাটির নীচ দিয়ে মাটি কেটে গর্ত করে চলেন। পারতপক্ষে তিনারা অতিকথনের ধারেপাশেও যান না।

অতিকথনের এ বদভ্যাস পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নানা ঝুটঝামেলা সৃষ্টি করে থাকে। কোনো কোনো সময় তা ডেকে আনে মারাত্মক বিপর্যয়। আর সে জন্যই অভিজ্ঞরা অতিকথনকে পরিহার করার পরামর্শ দেন, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে। কারণ দেখা গেছে যে, বেশি কথা বললে লাভের চেয়ে ক্ষতিরই আশঙ্কা থাকে বেশি।

গত বছর বাজেট বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের উপদেশ দিয়েছেন বেশি কথা না বলার জন্য। ১৭ জুন মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনানুষ্ঠানিক আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি সংসদের বাজেট আলোচনায় মন্ত্রীদের বাড়তি কথা না বলার পরামর্শ দেন বলে পত্রিকার খবরে বলা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, `কেউ কেউ বাজেট আলোচনার কথা বলতে গিয়ে রীতিমতো খেই হারিয়ে ফেলেন। ফলে বাজেট বক্তব্য ঠিকমতো হয় না। বাজেট নিয়ে যুক্তিনির্ভর কথা বলতে হবে। বাজেটের মধ্যে আলোচনা সীমিত রাখতে হবে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয়ও আলোচনায় থাকবে। তবে কিছুতেই অযাচিত কথা বলা যাবে না। প্রয়োজনের বাইরে কোনো কথা বলার প্রয়োজন নেই`। মন্ত্রীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর এ পরামর্শ বা নির্দেশনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। কেননা, আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের প্রায়ই অপ্রয়োজনীয় কথা বলতে শোনা যায়, যা জনমনে বিভ্রান্তি, ক্ষোভ, বিস্ময় সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে তাতে বক্তার জ্ঞান-গরিমাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

আমাদের বর্তমান শিল্পমন্ত্রী, করোনা শুরুর প্রাক্কালে ইতালি থেকে ফেরত বাংলাদেশী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটা বক্তব্য সরকারকে চরম বিব্রত করে। আমাদের বর্তমান স্বাস্থ্য মন্ত্রীর অতিকথন শুধু সরকারকেই নয়, সরকার সম্পর্কে করোনা ইস্যুতে দেশের সাধারণ মানুষের মনে আতংক ছড়ায়, ছড়াচ্ছে। তবুও তিনি মুখে লাগাম টানছেন না। বিগত আমলে আমাদের সাবেক অর্থমন্ত্রী ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী মাঝে মাঝে এমন বক্তব্য দিতেন যে তাতে সাধারণ মানুষের পিলে চমকে যাবার দশ হতো। গত বছর ডেঙ্গু নিয়েও বেফাঁস বক্তব্য দিয়েছেন মন্ত্রী-মেয়ররা।

প্রিয়া সাহা ইস্যুতে মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য ও এমপির ‘অতিকথনে’ অস্বস্তিতে পড়ে সরকার। তাদের বক্তব্যের কড়া সমালোচনা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রিয়া সাহা তো এক কাঠি বেশি সরস হয়ে আমেরিকায় থাকার কুমতলবে আগ বাড়িয়ে বলে ফেলেন যে, বর্তমান সরকারের আমলে ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু মানুষ নিখোঁজ। তার এ বক্তব্যের পর দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এ থেকে বাদ যাননি তখনকার মন্ত্রিসভার সদস্যরাও। তাদের কেউ বলছেন, ‘দেশে ফিরলে বিচারের আওতায় আনা হবে’, আবার কেউ বলছেন, ‘প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি আইন ব্যবস্থা নয়, ‘প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে হুট করেই ব্যবস্থা না’, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, ইত্যাদি। যা হোক, বেশি উদাহরণ দিয়ে লেখা দীর্ঘ করতে চাই না।

এবার আসি মফঃস্বলের রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে। সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ টীমের করা জরিপে দেখা গেছে যে, গত ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখা হাসিনার কাছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের যে তালিকা দেওয়া হয় তা নিয়ে কিছু বিতর্ক থাকলেও বুঝা যায় যে, দেশে আওয়ামী লীগার হওয়াতে চরম বিপ্লব সাধিত হয়েছে। এখন সারা দেশে লাখ লাখ অনুপ্রবেশকারী পদ বাণিজ্য আর কমিটি বাণিজ্যের বদৌলতে সাচ্চা আওয়ামী লীগার বনে গেছেন। তাদের অতিকথনে তৃণমূল পর্যায়ে আজীবন বঙ্গবন্ধু প্রেমিকেরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। সাধারণ মানুষের কাছে নৌকার পক্ষে ভোট চাওয়ার অবস্থা নেই কোন কোন এলাকায়। অনুপ্রবেশকারীরা অতিকথনে মাধ্যমে প্রমাণ করতে চান যে, তারা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার চেয়ে বড় আওয়ামী লীগার। কারণ একসময় তারা তাদের ঐ মুখেই বঙ্গবন্ধু ও তার কন্যা শেখ হাসিনার চোদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করে এখন হয়েছেন কঠিন আওয়ামী লীগার।

অনেকেই জানেন যে, উইনস্টন এস চার্চিল ছিলেন ইংরেজ রাজনীতিবিদ ও লেখক। তিনি যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অধিক পরিচিত। চার্চিলকে যুক্তরাজ্য ও বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রথম জীবনে তিনি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর সদস্য ছিলেন। ১৯৫৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি একটা মজার কথা বলেছিলেন, যা এখানে তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না। তিনি বলেছিলেন-

“A good speech should be like a woman’s skirt; should be long enough to cover the subject and short enough to create interest’.

আমি উইনস্টন এস চার্চিলের এই কথার বাংলা অনুবাদটা এভাবে করতে চাই-“একটি ভাল বক্তব্য একজন সুন্দরী যুবতী মহিলার স্কার্টের মতো হওয়া উচিত; যা তার আব্রু ঢাকার জন্য যথেষ্ট দীর্ঘ এবং সেই সাথে ততটুকুই ছোট যা সবার মাঝে আগ্রহ তৈরি করতে খুবই সামর্থ।”

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট