‘মানবিক সরকারের চিন্তা বাদই দেই,ন্যূনতম আত্মসম্মান থাকলে সরকারের উচিত ছিল ভারত শক্তভাবে জবাব দেওয়া’

0
177

‘ভারতে অনুপ্রবেশ করে গরু আনতে গিয়ে গুলিতে কেউ নিহত হলে সরকার কোনও দায়িত্ব নেবে না।’ —কথাটি পড়ে মনে হচ্ছে না এটি ভারতীয় কোনও কর্মকর্তার কথা? কিন্তু না। এ বছর ২৩ জানুয়ারি নওগাঁর পোরশা উপজেলার দুয়ারপাল সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ জওয়ানদের গুলিতে তিন বাংলাদেশি নিহত হওয়ার প্রেক্ষিতে এই মন্তব্য করেন বাংলাদেশের খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার।।সীমান্ত হত্যা নিয়ে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা হলে তিনি বলেন, ‘সীমান্ত হত্যা বাড়ার কারণ সীমান্তবর্তী এলাকার কিছু লোকের বেপরোয়া আচরণ। তাদের ব্যাপারে বিজিবি ও বিএসএফের প্রতিবেদন একই। তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা চলছে।’ এমনকি বিজিবির পক্ষ থেকেও একই ধরনের কথা বলা হয়েছে বারবার। ২০১৬ সালে তৎকালীন বিজিবি প্রধান স্পষ্টভাবে জানান, ‘গরু চোরাকারবারি বন্ধ না হলে সীমান্ত হ্ত্যা বন্ধ সম্ভব নয়।’ এ বিষয়ে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যও কম চমকপ্রদ নয়। তার মতে, ‘সীমান্ত হত্যা বন্ধে ঢালাওভাবে ভারতকে দোষারোপ না করে আমাদের নিজেদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। আর যারা মারা যাচ্ছে, তাদের অধিকাংশই চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত।’ যে কথাগুলো ভারতের তরফ থেকে আসার কথা ছিল, ঠিক সেই কথাগুলোই বলেছেন বাংলাদেশ সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিরা।

এই কথাগুলোর সরল বাংলা করলে দাঁড়ায় যেহেতু কিছু বাংলাদেশি সীমান্তে গরু চোরাচালান এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের সঙ্গে জড়িত, সেহেতু বিএসএফ চাইলে তাদের গুলি করে মেরে ফেলতে পারে। যদি ধরেও নেই কিছু বাংলাদেশি গরু চোরাচালান বা অবৈধ অনুপ্রবেশের সঙ্গে জড়িত, তাহলেও সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পৃথিবীর আর সব দেশের মতো ভারতেও আইন আছে। আমাদের কেউ যদি অবৈধ অনুপ্রবেশ করেই থাকে তাহলে তাদের আইনের আওতায় নেওয়াই একটা সভ্য রাষ্ট্রের পদক্ষেপ হওয়া উচিত। মানবিক সরকারের চিন্তা বাদই দেই, ন্যূনতম আত্মসম্মান কিংবা দেশের মানুষের প্রতি জবাবদিহিতা, দায়িত্ববোধ থাকলে বাংলাদেশ সরকারের উচিত ছিল ভারত সরকারকে খুব শক্তভাবে জানিয়ে দেওয়া যদি কোনও বাংলাদেশি কোনও কারণে ভারতে অনুপ্রবেশ করেও থাকে তাহলেও তাকে কোনোভাবেই বিএসএফ হত্যা করতে পারে না। এমনকি বাংলাদেশ সরকার এ প্রশ্নটি তো ভারতকে করতেই পারতো যে প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্রের ব্যবহার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হলেও ভারত সেটা কেন মেনে চলছে না?

সরকারের এই ধরনের প্রশ্রয়মূলক কথার অবধারিত ফল হয়েছে অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যা আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তাদের হিসাবে উঠে এসেছে ২০২০ সালের প্রথম ছয় মাসেই পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় বেশি বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা করা হয়েছে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে। বিবিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই বছরের প্রথম ছয় মাসে সীমান্তে ২৫ জন বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২১ জনেরই মৃত্যু হয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফের গুলিতে। আর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের পুরো সময়টায় বিএসএফের হাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৪৩ জন বাংলাদেশি, যাদের মধ্যে ৩৭ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন গুলিতে আর বাকি ছয় জনকে নির্যাতন করে মারা হয়। অন্যদিকে ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ৩ গুণ বৃদ্ধি পায়। গত বছর জুলাই মাসে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন গত ১০ বছরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের হাতে ২৯৪ জন বাংলাদেশি নিহত হন। যদিও বেসরকারি সংস্থা ও জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে এই সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বেশি। এমনকি এই লেখাটি যখন লিখছি তখনই বাংলা ট্রিবিউনের আপডেট বলছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবচর উপজেলার তেলকুপি সীমান্তে ঘাস কাটার সময় জাহাঙ্গীর নামে এক কৃষককে গুলি করে হত্যা করেছে বিএসএফ। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় জাহাঙ্গীর।

২০১৭ সালে একটি সীমান্ত হত্যা বাংলাদেশের মিডিয়ায় প্রচণ্ড ভাইরাল হয়েছিল। গোবিন্দ গৌতম নামের এক নেপালি যুবক ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন। এরপর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল বিষয়টি নিয়ে নেপালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দহলের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করেন। নিহত হওয়ার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন দোভাল। নিহতের পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন এবং ওই বিষয়ে তদন্তের জন্য নেপাল সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন দোভাল। নানা বিবেচনায় আমাদের চেয়ে দুর্বল রাষ্ট্র নেপালের ক্ষেত্রে ভারত যা করলো আমাদের ক্ষেত্রে কেন ঠিক তার উল্টোটা, এটা এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যেখানে গত এক দশকে প্রায় ১০০০ মানুষ ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নিহত হন যার বেশির ভাগই বাংলাদেশি, সেখানে ভারত একবার দুঃখ পর্যন্ত প্রকাশ করেনি আর সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের আশ্চর্যজনক নীরবতা এবং কিছু সমর্থনসূচক মন্তব্য কেবল তাদের দেউলিয়াত্বের পরিচয়ই বহন করেনি বরং এই হত্যাযজ্ঞকে নীরবে উৎসাহিতও করেছে।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ ছাড়াও স্থলসীমান্ত আছে পাকিস্তান, চীন, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমারের। চীন ভারতের চেয়ে অনেক বড় শক্তি, পাকিস্তানের পারমাণবিক বোমা আছে এই বিবেচনায় এই দুই দেশকে যদি সরিয়েও রাখি বাকি দেশগুলো কিন্তু বাংলাদেশের তুলনায় নানা দিক থেকে দুর্বল। অথচ এসব দেশের সীমান্তে ভারতের সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে মৃতের সংখ্যা শূন্য।
প্রথমবার ক্ষমতায় এসেই ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ‘প্রতিবেশী প্রথম’, ‘সবার সঙ্গে সবার বিকাশ’ ইত্যাদি স্লোগানে আর নীতিতে তার পররাষ্ট্রনীতি সাজিয়েছিলেন বলে একটা ধারণা পাওয়া যায়। তিনি তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সার্কের সকল সরকার প্রধানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তার এই নীতি প্রাথমিকভাবে নানা জায়গায় প্রশংসিত হলেও পরবর্তীতে তারা একে একে এই নীতি থেকে সরে আসে। এই সরে আসা যে ভারতের জন্য ভালো হবে না, সেই আভাস ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পত্রিকায় প্রকাশিত খবরের শিরোনাম দেখলেই বোঝা যায়। ২০১৭ থেকে ২০২০ এর মধ্যে প্রকাশিত এমনই কয়েকটি লেখার শিরোনাম হলো—
Modi’s neighborhood first policy: losing the neighborhood (The Hindu)
Modi’s neighborhood first push is being pulled down by decades of policy stagnation (The Print)
Why the neighbors dislike India? (The new Indian Express)
মজার বিষয় হলো—এই লেখাগুলো ভারতের ক্ষমতাসীন সরকারকে প্রতিবেশীদের প্রতি মনোযোগী করার পরিবর্তে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে চিরশত্রু পাকিস্তান তো বটেই ভারতের পাশে এখন ভুটান, শ্রীলঙ্কা বা মালদ্বীপকেও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। আর কিছুদিন আগে সীমান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক যথেষ্ট উত্তপ্ত হয়েছে। এর এক ধরনের অনিবার্য ফল দেখা গেছে সাম্প্রতিক সময়ে লাদাখে। সেখানে সীমান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে চীন-ভারতের যে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে সেখানে ভারত নিজেকে ভীষণ একা হিসেবে দেখেছে। চীন-ভারত সাম্প্রতিক সংকট নিয়ে ২৩ জুন বিখ্যাত Foreign policy নিবন্ধ প্রকাশ করেছে “ India is paying the price for neglecting its neighbors” এই শিরোনামে। এই প্রসঙ্গে ২৯ জুন প্রকাশিত South China Morning Post-এর বিশ্লেষণের শিরোনাম ‘India’s bullying of its neighbors boosted China. Now it needs to build a strong backyard’। একই ধরনের প্রতিবেদন হচ্ছে ভারতের ভেতরেও। গত ২৬ জুন Outlook একটি বিশ্লেষণ ছেপেছে যার শিরোনাম হলো, ‘Why India feels concerned than never before by a hostile neighborhood’।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে কেমন আচরণ করা উচিত সেটা একান্তই ভারতের নিজস্ব ব্যাপার। ভারতের আচরণের ভ্রান্তির আলোচনা ভারতের ভেতরেই আছে যথেষ্ট পরিমাণে। কিন্তু সীমান্তে ভারতের দিক থেকে আমাদের নিরীহ নাগরিকদের হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে দেখার যে তীব্র কষ্ট ক্ষোভ সেটি ভারত কেন এমন করছে সেই কারণে না, বরং এটা এই কারণে যে আমাদের সরকার আমাদের রক্ষা করার জন্য কিছু করছে না, সেটা দেখে। সত্যিকার অর্থে নাগরিক হিসেবে আমাদের যাবতীয় দাবি আমাদের সরকারের ওপরই। ক্রমাগত সীমান্ত হত্যা একটা জিনিস খুব স্পষ্ট করে, আমাদের সরকার আমাদের মানুষদের রক্ষার জন্য যথেষ্ট কঠোর অবস্থান নেয়নি বরং আমার আগের আলোচনায় দেখিয়েছি অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্রয়মূলক কথাবার্তা বলেছে। কঠোর অবস্থান নিলে এমন পরিস্থিতি বছরের পর বছর চলতে পারতো না।

দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারিত হয় বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক, কৌশলগত, ভূ-রাজনৈতিক নানা দেনা-পাওনার নিরিখে। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত হত্যাসহ আর সব সমস্যার সমাধান ঠিক এসব বিনিময়ের মাধ্যমেই করা উচিত। সীমান্ত হত্যা নিয়ে সরকারের অবস্থান আমাদের কাছে এটা খুব স্পষ্ট করে, এই সরকারের রাজনৈতিক এবং কৌশলগত চরম কোনও দুর্বলতাই ভারতের সঙ্গে এই ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নিতে বাধা দেয়। জনগণের সেই দুর্বলতা চিহ্নিত করা উচিত এবং বোঝা উচিত এরকম দুর্বলতা কোনও সরকারের থাকলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকবেই।

একাত্তর সালে সম্পর্কটা দুই দেশ ও জনগণের মধ্যে হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে নানা কারণে সম্পর্কটা শুধু সরকারি পর্যায়ে বা দলীয় স্তরে চলে গেলে অ্যালিয়েনেশন বা দূরত্ব তৈরি হয়। এখনই সময় এই দূরত্ব দূর করে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার, তাদের চোখের ভাষা বুঝতে পারার। বাকি সব দেনা পাওনা যদি ভুলেও যাই প্রতিদিন সীমান্তে লাশ ফেলে সম্পর্ক দৃঢ় করা তো দূরেই থাকুক, প্রতিবেশীর মনে ঘৃণা তৈরি ছাড়া আর কিছুই আশা করা যায় না।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

বিষয়: রুমীন ফারহানা