মাত্র ৩ মাসেই পাল্টে গেছে পৃথিবী

0
35

আমাদের সকলের মহান আল্লাহর উপর পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা রেখে সকল ধরনের সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করে করোনাভাইরাস সমস্যার মোকাবেলা করতে হবে। কেউ যদি প্রাণঘাতী বিপদের সময় নিরাপত্তা মূলক সতর্কতা অবলম্বন না করে তাহলে তার আল্লাহর উপর বিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্কের সময় কেউ যদি বলে – আমার ঈমান অনেক মজবুত, আমার স্রষ্টার প্রতি অঘাত বিশ্বাস, আমার কিছুই হবে না, আমি আমার মতো চলবো, আমার ভাগ্যে আল্লাহ যা রেখেছেন তাই হবে – এ ধরনের চিন্তা স্রষ্টার কাছে কখনোই পছন্দনীয় নয়। বরং মহামারীর মত বিপদের সময় যারা সুস্থ থাকার জন্য বিষেশজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামত ও নির্দেশনা মেনে চলেন তারাই শুধু আল্লাহর প্রতি ঈমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন।

কাজেই সকল বিপদের সময় স্রষ্টার প্রতি অনুগত থেকে ধর্য্য ধারণ করে বিপদ থেকে পরিত্রান পাওয়ার সকল প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার মাধ্যমেই স্রষ্টার সন্তুষ্টি পাওয়া যাবে। ইসলাম ধর্ম সহ সকল ধর্মে প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে ইসলাম ধর্মে এব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ তাগিদ দেওয়া আছে।

করোনাভাইরাস জনিত মানবতার বিপর্যয়ের সময় সংক্রমণ ঠেকানোর অন্যতম প্রধান উপায় হলো নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করা। আমি যদি সংক্রমিত হয়ে থাকি তাহলে শুধু ঘরে অবস্থান করে ইসোলেশনে থেকে আমি অন্য একজন সুস্থ ব্যক্তিকে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারি। আমি যদি সুস্থ থাকি তাহলেও নিজ ঘরে অবস্থান করে অন্য কোনো রোগী বা কোনো উপকরণের মাধ্যমে সংক্রমিত হওয়া থেকে নিজেকে তথা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিরাপদ রাখতে পারি। এখানে কিন্তু প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব পালনের চমৎকার দৃষ্টান্ত ফুটে উঠেছে। বাড়িতে থেকে নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করা, বারবার সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ড সময় ধরে হাত ধোয়া, পরিষ্কার পরিছন্ন থাকা আমাদের সকলের অন্যতম সামাজিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে আমরা করোনাভাইরাস জয়ের যুদ্ধে সবচেয়ে বড় অবদান রাখতে পারি।

মানবজাতি বেপরোয়া গতিতে একটার পর একটা অন্যায় করেছে, অপরাধ করেছে, সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে অমান্য করে, ব্যাহত করে অমার্জনীয় পাপ করেছে। কারণ আল্লাহ পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট ভাষায় মানবজাতি সৃষ্টির উদ্দেশ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন “আমি জ্বিন ও মানবজাতিকে শুধু আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” কাজেই স্রষ্টা যা চান তা করা ও তার নির্দেশিত পথে চলার নামই হলো প্রকৃত ইবাদত। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনাদর্শেই স্রষ্টার ইচ্ছার পূর্ণতা মিলে।

সারাক্ষণ মিথ্যা কথা বলে, সুদ/ঘুষ খেয়ে, হিংসা-বিদ্বেষ ও মুনাফেকি করে এবং বেহায়াপনায় লিপ্ত থেকে লোক দেখানো নামাজ, রোজা ও অন্যান্য আমলের নাম ইবাদত নয়। যে ব্যক্তি নামাজ পড়ে কিন্তু মিথ্যা কথা বলে, রোজা রাখে কিন্তু ঘুষ খায়, জাকাত দেয় কিন্তু সুদ খায়, হজ্জ করে এসে আবার পাপ কাজে লিপ্ত হয় – এই ব্যাক্তির ইবাদত কোনো দিন আল্লাহর কাছে গ্রহণ যোগ্য হবে না। মানুষ হিসাবে সৃষ্টির উদ্দেশ্য তখনই সফল হবে যখন আমরা সৃষ্টিকর্তাকে রব হিসাবে মেনে নিয়ে তার দাসত্ব স্বীকার করে পূর্ণ অনুগত্য প্রকাশ করবো। স্রষ্টার নির্দেশিত পথে চলবো এবং তাঁর কাছে নিজেকে সোপর্দ করে তাঁকে সিজদা করবো।

মহান আল্লাহ তাঁর ইবাদতের জন্যে মানবজাতিকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসাবে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে বোধ শক্তি ও সুষ্ঠ বিবেক প্রদান করে তা তার অন্তরের সাথে যুক্ত করে দিয়েছেন। আল্লাহ মানুষকে পৃথিবীর সবচেয়ে দায়িত্বশীল প্রাণী হিসাবে তৈরী করে মানুষের ভোগের জন্য পৃথিবীর ভান্ডার খোলে দিয়েছেন। মহান আল্লাহ একটি পরিকল্পিত গঠনতন্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর সকল কার্যক্রম পরিচালনা করেন। মানবজাতির কল্যাণের জন্যে, সফলতার জন্যে আল্লাহ যুগে যুগে আসমানী কিতাব প্রেরণ করেছেন। পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ করার মধ্য দিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের সফলতার অপরিবর্তনশীল নির্দেশনা দিয়েছেন।

আল্লাহ প্রদত্ত হুকুম ও দিকনির্দেশনা মানা ও অনুশীলন করা এবং তার মাধ্যমে পৃথিবীতে শান্তির পরিবেশ গড়ে তোলার মধ্যেই মানুষের শ্রেষ্ঠত্যের বৈশিষ্ট নিহিত। আমরা কি তা করতে পেরেছি? জীবনের কঠিন বাস্তবতায় দায়িত্ব বোধ ও কর্তব্য পরায়নতা মনুষ্যত্বের প্রতীক এবং স্রষ্টার আমানত। দেশের এই মহা দুর্যোগের সময় এই মানবিক মূল্যবোধকে আমরা কি আরো বেশী সমৃদ্ধ করতে পেরেছি?

মানবতার ও মানব সভ্যতার এত বড় বিপর্যয় আমরা আমাদের জীবদ্দশায় আর কখনো দেখেনি। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মৃত্যু আতঙ্ক নিয়ে আমরা এক কঠিন সময় পার করেছি। নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় তখন আমাদের দেশের এক কোটিরও বেশী লোক প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। এবারের আতঙ্ক তার চেয়েও বেশী – কারণ পালিয়ে যাওয়ার নিরাপদ দেশ বা স্থান কোথাও নেই।

মাত্র ৩ মাসেই পাল্টে গেছে পৃথিবী। মানুষের বেঁচে থাকার ধারণাটাই যেন ক্ষীণ হয়ে আসছে। সারা পৃথিবী একটি অতিক্ষুদ্র অদৃশ্য ভাইরাসের কাছে নিরুপায় ও অসহায়। চারদিকে মৃত্যু সংবাদ। কত মানুষ সংক্রমিত হবে আর কত মানুষ মারা যাবে কেউ জানে না।

এটা কি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা? নাকি বায়োলজিক্যাল অস্ত্র বানানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মানবসৃষ্ট কোনো দুর্ঘটনা। নাকি সভ্যতার লাগামহীন দৌরাত্ম্যের ফলে প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্যহীনতাই এর কারণ। এই পৃথিবী নীরবে বছরের পর বছর অনেক অত্যাচার, অনেক নিপীড়ন সহ্য করেছে। সভ্যতার নিষ্ঠুরতা অকাতরে বন-জঙ্গল উজাড় করেছে, গাছ কেটে সাবার করেছে, পাহাড় কেটে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে, বাঁধ দিয়ে গতিপথ পরিবর্তন করে নদ-নদী গুলোকে হত্যা করেছে, রাসায়নিক সার দিয়ে, কীটনাশক ছিটিয়ে, যত্রতত্র এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করে ইকোসিস্টেমকে ধ্বংস করেছে। মানুষ্য তৈরী পলিথিন বর্জ্য, রাসায়নিক সমরাস্ত্র তৈরির কারখানা ও আণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ও বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের তীব্রতায় পরিবেশের শ্বাস বন্ধের উপক্রম হয়েছে।

আজ বনের প্রাণীকুল হারিয়ে যাচ্ছে, নদ-নদী, খাল-বিলের নানা প্রজাতির মাছ বিলিন হয়ে যাচ্ছে। পাখিদের কলকাকলি নেই। কীটপতঙ্গের অবাধ বিচরণ চোখে পরে না। আমাদের ধরণী কি আর সইতে না পেরে হঠাৎ করে প্রতিবাদী হয়েছে – একেই কি বলে `রিভেঞ্জ অফ নেচার`? পৃথিবী কি বিষাক্ত পদার্থমুক্ত, তীব্র যন্ত্রণামুক্ত ও পাপমুক্ত এক নতুন পৃথিবী রূপে আবির্ভূত হবে? মহান স্রষ্টা কি পৃথিবীকে দিয়ে তাই করিয়ে নিলেন। হয়তো স্রষ্টাও চেয়েছেন তাঁর সেরা সৃষ্টি মানুষ পাপমুক্ত হউক, পাল্টে যাক তাদের মানসিকতা ও জীবন যাত্রা। সীমান্ত ভুলে পৃথিবী দাঁড়াক এক আকাশের নিচে, চারদিকে জাগ্রত হউক মনুষ্যত্ববোধ, মানুষ হাত বাড়িয়ে দিক প্রতিবেশীর দিকে, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও সুবিধা বঞ্চিত মানুষের দিকে।

কেন জানি শত বিপদ ও আতঙ্কের মাঝেও মানসপটে একটি আশা জেগে উঠে – মনে হয় করোনাভাইরাস দিয়ে একটি বিরাট ঝাকুনি দিয়ে এই পৃথিবী আরও জীবনবান্ধব হবে, সকল দূষণ কমিয়ে পরিবেশ বিশুদ্ধ করে ফেলবে। হয়তো অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ভগ্ন অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প কারখানায় আবার প্রাণের সঞ্চার হবে, নদ-নদীতে জোয়ার আসবে। ফসলে, ফুলে ফলে পৃথিবী ভরে উঠবে। অন্ধকার পেরিয়ে এক নতুন পৃথিবীতে মানুষ আবার নতুন ভাবে বাঁচতে শিখবে।

লেখক: অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদ নূরুল হক, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সাবেক মহাপরিচালক স্বাস্থ্য।