করোনায় করুনা করুন কুরআনের হাফেজদেরকে

0
60
mad

প্রফেসর ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার

মরণগ্রাসী করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত, কল-কারখানা সবকিছুই যখন স্থবির হয়ে আছে তখন দেশের অর্থনীতি এবং সর্বস্তরের মানুষের মনকে চাঙ্গা রাখার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনেক পরিকল্পনা এবং প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন l খেটে খাওয়া, দিন মজুর ও অসহায় মানুষের জন্য ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন, যা জিডিপির ২.৫২ শতাংশ l এর মধ্যে শুধু পোশাক খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা এবং কওমি মাদ্রাসাসমূহে ৮ কোটি ৩১ লাখ টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর জন্য ১০০ কোটি টাকা l অন্যান্য কর্মহীন শ্রেণী-পেশার মানুষও হয়তোবা প্রধানমন্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন l

রমজান মাসের বিশেষ আকর্ষণ আল্লাহর মেহমান কোরআনের হাফেজগনও তাকিয়ে আছেন প্রধানমন্ত্রীর দিকে l কারণ মহামারী করোনা ঠেকাতে এইবার মসজিদে খতম তারাবী বন্ধ আছে l যদিও ৭মে দুপুর থেকে মসজিদ উন্মুক্ত করে দেওয়া ঘোষণা এসেছে l সে ক্ষেত্রে করোনা প্রতিরোধের সকল নিয়ম কানুন মেনে চলতে হবে l অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে যে করোনার ভয়ে তারাবি নামাজে মুসল্লির সমাগম খুব একটা হবে না l ফলে হাফেজদের বেকারই থাকতে হচ্ছে l অর্থাৎ কাজ নেই – বেতন নেই l আবার উপরে বর্ণিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায়ও পড়ছে কিনা তাও স্পষ্ট নয় l এদিকে কোরআনের হাফেজ হওয়ায় কারো কাছে লজ্জায় হাত পাততেও পারছে না l তাই পরিবার-পরিজন নিয়ে খেয়ে, না খেয়ে আছেন তারা l এমতাবস্তায় হাফেজদের জন্য একটি বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা এবং তা বাস্তবায়িত হলে আলেমসমাজ খুবই খুশি ও উপকৃত হবে l

রমজান মাসে হাফেজগণ মসজিদে খতম তারাবি পড়ান এবং খুব সামান্যই বেতন পেয়ে থাকেন l বড়জোর ১০, ২০, ৩০ হাজার টাকা l কোন কোন ক্ষেত্রে আরও কম l মুসল্লীরা প্রতিদিন ১০ টাকা, ২০ টাকা দিয়ে এই অর্থ জোগাড় করেন l মাস শেষে ২৭শে রমজান অর্থাৎ লাইলাতুল কদরের রাতে আখেরি মোনাজাতের পর হাফেজ সাহেবদেরকে ওই টাকা দেওয়া হয় l যদিও ইসলামের বৃষ্টিতে কোরআন খতমের বিনিময়ে টাকা নেওয়া বিধান নেই l যাহোক, নামাজ শেষে মুসল্লিরা হাফেজদেরকে ধরে কোলাকুলি করেন এবং মাথায় হাত দিয়ে ভবিষ্যতের জন্য দোয়া দিয়ে যান l কিন্তু এবার সেই সুযোগটুকুও নেই l

এদেশের অধিকাংশ হাফেজই অত্যন্ত গরীব পরিবার থেকে আসা l দরিদ্র পিতা-মাতা যখন সন্তানদেরকে সামান্য ভর্তি ও বেতনের টাকা দিয়ে নিজ এলাকার স্কুলে পড়ানোর সামর্থ্য থাকে না, তখনই দূরের কোথাও বিনামূল্যের মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দেন l নিষ্পাপ ফেরেশতাতুল্য শিশুগুলো মা-বাবার আদর বঞ্চিত হয়ে দূরের ওই মাদ্রাসায় পড়ে থাকে l পবিত্র কুরআন মাজীদে ১১৪টি সুরা ও ৬২৩৬টি আয়াত রয়েছে। হাফেজ হওয়ার এ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হতে সাধারণত ৩ থেকে ৬ বছর লাগে। এই কয়েকটি বৎসর তারা খুবই মানবেতর জীবন-যাপন করে কাটায় l যেমন নিম্নমানের খাবার, গাদাগাদি করে থাকা ইত্যাদি l এভাবে অনেকটা মা-বাবার অজান্তেই কেউ হয়ে ওঠে কোরআনের হাফেজ, কেউ হয়ে ওঠে যুক্তিবাদী মাওলানা l

হাফেজগণও এখন দেশের উন্নয়নে অনেক ভূমিকা রাখছে l গণতান্ত্রিক ধারায় এখন অনেক কোরআনের হাফেজ ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার, চেয়ারম্যান ও বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য হয়ে গ্রাম উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে l গ্রামের লোকেরা সামাজিক ও পারিবারিক সমস্যা সমাধানের জন্য অনেক সময় হাফেজ এবং ইমামদের শরণাপন্ন হয়ে থাকে l মৃত্যুবার্ষিকী কিংবা অন্য কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে প্রায়ই কোরআন খতমের আয়োজন করা হয় এই হাফেজদের মাধ্যমেই l মসজিদ ভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষায় এদের ভূমিকা অনেক l সাধারণত এরা খুব মেধাবী হয় l অত্যন্ত অল্প বয়সে পুরো কোরআন শরীফ মুখস্ত করে ফেলে l বিদেশেও তাদের অনেক সুনাম আছে l আন্তর্জাতিক কেরাত প্রতিযোগিতায় বিগত কয়েক বৎসর যাবৎ বাংলাদেশের ক্ষুদে হাফেজগণ শীর্ষস্থান অধিকার করে আসছে l অনেকেই স্কলার্শিপ নিয়ে মক্কা, মদিনা, মিসরসহ আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করছে l প্রতিবছর রমজান মাসে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে ক্ষুদে হাফেজদের কুরআন প্রতিযোগিতা দেখে সবাই মুগ্ধ হয় l দৈব চয়নের মাধ্যম কোরআন শরীফের মধ্য থেকে ছোট্ট একটি আয়াত পড়ে থাকেন মডারেটর l নিষ্পাপ ওই ক্ষুদে হাফেজ সেটা শুনেই সুরেলা কন্ঠে তেলাওয়াত শুরু করেন l টিভির সামনে বসা সারা বিশ্বের অগণিত রোজাদার তা শোনেন, দেখেন এবং চোখের পানি ফেলতে ফেলতে দুই হাত তুলে ক্ষুদে হাফেজদের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন l

মুসলমান সমাজে হাফেজরা খুবই সম্মানিত। কিন্তু আমাদের সমাজে স্থায়ীভাবে কাজ বা চাকরির তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই তাদের জন্য l তাই আল্লাহর মেহমান এই হাফেজদেরকে রমজান উপলক্ষে কিছুটা সম্মান করা উচিত l এমতাবস্থায় পবিত্র ঈদের পূর্বেই হাফেজগণ এধরনের একটি আর্থিক সুযোগ পেলে খুবই উপকৃত এবং কৃতার্থ হবে l অতঃপর খুশিমনে শবেকদরের রাতে এবং ঈদের জামায়াত শেষে সকল হাফেজগণ যদি একসাথে দুই হাত তুলে আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন – নিশ্চয়ই আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠবে এবং কবুল হবে তাদের দোয়া l কল্যাণ হবে দেশের এবং দেশের মানুষের l দূর হবে করোনার তাণ্ডব, দূর হবে সকল বালা-মুসিবত ইনশাআল্লাহ l

লেখক : পরিচালক (আইআইটি) এবং তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় l