ড. আনিসুজ্জামান ও ‘সাম্প্রদায়িকতা’

0
41

গত ১৪ মে ঢাকায় জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যান। মৃত্যুর পর জানা যায় তিনি করোনাভাইরাসেও আক্রান্ত ছিলেন। তবে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগেও ভুগছিলেন। তিনি ভারতের ‘পদ্মভূষণ’ খেতাব পাওয়া বাংলাদেশের একজন একাডেমিক। যে কোনো মৃত্যুই শোকের। আমরা তার মৃত্যুতে গভীর শোক জানাই।

তিনি বাংলাদেশ সরকারের যত সর্বোচ্চ পদক বা সম্মাননা আছে তার সম্ভবত কোনো কিছুই লাভ বা অর্জন করা থেকে বাদ যাননি। তাই বর্তমান সরকারের ‘ইডিওলজিক্যাল আইকন’ মনে করা যেতে পারে তাকে। তিনি ভারতের তৃতীয় রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’ পদকও লাভ করেছেন। কোনো দেশের সমাজে রাজনৈতিক মতামতে নানাবিধ ভিন্নতা থাকে, এটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় এটা আর এখন নিছক মতভিন্নতা নয় বরং তীব্র এক সামাজিক পোলারাইজেশনের পর্যায়ে চলে গেছে। ড. আনিসুজ্জামান এই মেরুকরণে একটা পক্ষের অন্যতম আইকন ছিলেন বলে তার ভূমিকায় প্রমাণিত।

পাকিস্তান নামে ১৯৪৭ সালে আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যাওয়ার সময় থেকেই আমরা পাকিস্তান পছন্দ করি অথবা না করি কঠিন সত্যটা হলো, পূর্ববঙ্গের বাসিন্দা প্রত্যেকেই পাকিস্তান জন্মের বেনিফিসিয়ারি বা সুবিধাভোগী কোনো-না-কোনোভাবে। সেটি অন্তত এই মহাসত্যের কারণে যে, সাতচল্লিশের আগে তারা ছিলেন জমিদারের প্রজা অথচ পাকিস্তান হবার পরে তাদের এক প্রকার মুক্তি ঘটেছিল। প্রজা পরিচয় থেকে মুক্তি বলতে শুধু জমিদারি উচ্ছেদই নয়, স্বাধীন পাকিস্তানে ওই চাষাবাদের জমির ভোগদখলের দলিল পেয়েছিলেন ‘চাষা’রা নিজের নামে, অন্তত ১৯৫১ সালের পরে। ধর্ম বা দল নির্বিশেষে মূলত সবাই প্রত্যেকে এতে লাভবান। এমনকি যারা পাকিস্তান আন্দোলন করেননি বা পাকিস্তান কায়েম হওয়া পছন্দ করেননি তারাও হয়েছেন লাভবান।

আজব ঘটনাটা হলো, স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হবার পরবর্তী কালের পাকিস্তানে ‘সাতচল্লিশের দেশভাগ’ যে সঠিক হয়েছিল এমন কোনো বয়ান ছিল না। পাকিস্তান কায়েম ‘সঠিক’ বলে ইতিহাসে তা লিখতে দ্বিধা ছিল। টেক্সটবুকে পাকিস্তান কায়েমের পক্ষে সাফাই বক্তব্যের দেখা মেলে না। এখনো এমনই আছে। যেন পাকিস্তানের জন্ম ‘অবৈধ’, যার দায়িত্ব কেউ নিতে চায় না । অথচ বাসিন্দারা আসলে এর সুবিধাভোগী। জমিদারি আইন উচ্ছেদের সুবিধা উত্তরসূরিরা প্রত্যেকে ভোগ করে গেছেন, এখনো করছে। তবুও ১৯৪৭-১৯৭১ এ সময়টা আমাদের ইতিহাসে যেন একটা ভ্যাকুয়াম। তখন কি কিছুই হয়নি? অথবা কী হয়েছিল সেটি কেউ বলতে চান না। তাহলে ‘এরা’ জমির মালিকানা পেলেন কী করে? কেউ বলতে চান না। তারা সম্ভবত বলতে চান, পাকিস্তান কায়েম হওয়াটাই ভুল ছিল। পাকিস্তান জন্মানোর পরে আমাদের অন্যান্য চাহিদা বা অভিমুখ তৈরি হতেই পারে। পাকিস্তানই ভাঙতেও চাইতে পারি। কিন্তু সে জন্য তো পাকিস্তান কায়েম হবার ঘটনাটা মিথ্যা নয়।

ইতিহাস জিনিসটা এমন যে, নানা দেশ-রাষ্ট্র অনুসারে এসবের বিষয়ে ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন ভাষ্য হবেই। এমনকি একই দেশের ভেতরেও অন্তত তিনটি ভিন্ন ভাষ্য দেখা যেতে পারে। সব দেশেই এমন হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে মোটামুটি মৌলিক গল্পকাঠামো ভাষ্যটা একই, আর বাদবাকি অংশ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতেই থাকে। তবে দুটো ভিন্ন রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে পুরা বয়ানই ভিন্ন হয়ে যাবে। যেমন পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ভাষ্য-বয়ান ভিন্ন হবেই। ১৯৭১ সাল নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের ভাষ্যও হবে ভিন্ন। পাকিস্তান কায়েমের পরে পূর্ব-পাকিস্তানের নিজের লিখিত ভাষ্য-বয়ান না থাকায়, পূর্ব পাকিস্তানিরা আপন করে নেয় এমন বয়ানভাষ্য না থাকায় কী হয়েছে? এমন লিখিত ইতিহাস ভাষ্য না থাকলে যেটা হবার কথা, কলকাতায় প্রচলিত টেক্সটবুকের ভাষ্যবয়ান কিছু দিন পরে এখানে চালু হয়ে যেতে পারে। কারণ, বয়ান খালি থাকে না। একসময় বাংলাদেশেরই কেউ হয়তো কলকাতার সেসব বই পড়ে তা থেকে নিজেই কলকাতার বয়ানে বাংলাদেশের ইতিহাস লিখে বসবেন। আর তা চালু হয়ে যাবে। আমরা কলকাতার বয়ানে ইতিহাস পড়লে অসুবিধা কী? অসুবিধা হলো ওটা আসলে কলকাতার জমিদারির আধিপত্যের স্বপক্ষে এক সাফাই-ভাষ্য।

ড. আনিসুজ্জামান আমাদের কাজ কিছুটা সহজ করে দিয়েছেন প্রথম আলোতে এক সাক্ষাৎকার দিয়ে ২০১৪ সালে, আর সেটিই গতকাল নতুন শিরোনামে পুনঃমুদ্রিত হয়েছে। পুরানা শিরোনাম ছিল, ‘বাংলা সাহিত্যে যা আছে, সবই আমার’। ওখানে তিনি বলছেন, বাবা-মাসহ তার পরিবার কলকাতায় থাকার সময় পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন, স্লোগান দিয়েছেন। সাতচল্লিশের দেশ ভাগের পরে পরে ওপার বাংলার ২৪ পরগনার বসিরহাটের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও নতুন পাকিস্তানে এসে পড়েছিলেন। নানা সুযোগ- সুবিধার জন্য খুলনায় পুরা পরিবার মোহাজের হয়ে বসবাস শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানে আসার পর এবার মুসলিম লীগের সমর্থন ছেড়ে দিলেন। কেন? তিনি বলছেন, ‘১৯৪৬ সালে সাম্প্র্রদায়িক দাঙ্গার সময়’ থেকে ‘আমার মনে জিজ্ঞাসা জাগল’। তিনি বলছেন, ‘হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা, মানুষের মৃত্যু, এসব আমার মন-মানসিকতা বদলে দেয়’। এর পরের প্যারায় আরেকটু পরিষ্কার করে বলছেন, ‘একদিকে সাম্প্র্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি; আবার পাকিস্তান টিকে থাক, সেটাও চাচ্ছি।’ তার মানে পাকিস্তান টিকে থাকাটাকে তিনি কথিত সাম্প্র্রদায়িকতা বলছেন। আর শেষে বলছেন, ‘তখন সাম্প্র্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়েই পাকিস্তানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে শুরু করে।’ অর্থাৎ এবার আমরা জানতে পারছি তার চিন্তা ও মনের হিসাবে ‘শত্রু’ বলে তিনি যাকে চিনেছেন তা হলো ‘সাম্প্র্রদায়িকতা’। কিন্তু সাম্প্র্রদায়িকতা বলে তিনি কি আসলে সেটিকে চিনেছেন? মনে হয় না। তিনি বরং সাম্প্র্রদায়িকতা বলে আবছা আড়ালে দাঁড়াতে চাচ্ছেন। কেন?
‘সাম্প্র্রদায়িকতা’ মানে কী? সেটি বুঝতে হবে আগে।

তিনি কি বলতে চাইছেন ১৯৪৬ সালে কলকাতার দাঙ্গা থেকে আজ পর্যন্ত যত হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা ঘটেছে, তার সবগুলোর জন্য দায়ী মুসলমানরাই? আনিসুজ্জামান হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ঘটা দাঙ্গাকেই ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা’ বলতে ভালোবাসেন এবং কেবল মুসলমানদেরকেই দায়ী করেন এ জন্য। এখান থেকেই তার ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে অভিযোগের প্রসঙ্গ।

প্রথমত, সমাজে দুটো সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা ঘটলে তা সংশ্লিষ্ট পাড়া বা এলাকায় যে আগে থেকেই আধিপত্যে থাকে, সেই ‘অপরপক্ষ’কে উৎখাত ও বিনাশ করে ছাড়ার উদ্যোগ নেয়া স্বাভাবিক। এর কারণ হলো, সমাজ দুটো সম্প্রদায়ে বিভক্ত হয়ে যাওয়া মানে, তারা তখন পরস্পরের কাছে থাকা অনিরাপদ বোধ করা শুরু করে। এই নিরাপত্তার অভাববোধ থেকে যারা শক্তির আধিপত্যে আছে, তারা বিপক্ষকে প্রথমে নির্মূল করে এলাকায় নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেয়। এতেই দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়, তাতে শেষে কে মরবে-বাঁচবে তা অন্য কথা। কাজেই দাঙ্গা হলেই তাতে হিন্দু অথবা মুসলমান কোনো একটা সম্প্রদায়কে আগাম ও একচেটিয়াভাবে দায়ী করা ভুল। এটা আগাম নির্ধারিত পক্ষপাতিত্ব। এ ছাড়া আগের ২০০ বছর ধরে জমিদারি অত্যাচার নির্যাতনে যে এই ক্ষোভগুলোর জন্ম ও তৈরি হচ্ছিল তা গ্রাহ্য না করে জমিদারি চালিয়ে গেলে একদিন এমন পরিণতিই হবে। তা কেন কেউ ভাবেনি? এখন ভিকটিমহুড দেখিয়ে সহানুভূতি পেতে চাইলে তা কতটা কাজের হবে?

এ ক্ষেত্রে আনিসুজ্জামানের কাছে তার ‘সাম্প্রদায়িকতার’ অর্থ হলো, তার চোখে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ মানেই মুসলমানরা দায়ী। অথচ হিন্দু ডোমিনেটিং এলাকায় সে মুসলমানকে কোপাবে- এটাও স্বাভাবিক। কে কম কে বেশি, এসব কূট তর্ক। তবে বিনা দাঙ্গায় সব ক্ষোভ নিরসন করতে পারা একটা সাফল্য হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, এই ‘সাম্প্রদায়িকতার’ বুঝ একপেশে, অর্থহীন। আমাদের জ্বর হওয়া হলো রোগের লক্ষণ, আসলে তা রোগ নয়। ঠিক তেমনি ‘সাম্প্রদায়িকতা’ সমাজের মূল সমস্যা নয়, এটা সমস্যার লক্ষণ। তাই কেন দাঙ্গা লাগছে সে দিকে মনোযোগ না দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা বলে হিন্দু অথবা মুসলমানকে অভিযুক্ত করা নিরর্থক। এর পেছনের কারণ খুঁজে বের করে স্থায়ী সমাধান পেতে হবে।

তৃতীয়ত, স্বাধীন অখণ্ড ভারত গড়তে ১৮১৫ সাল থেকে রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগ আর সেখান থেকে মাঝে ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম পেরিয়ে ১৯৪৭ পর্যন্ত ভারতের ‘সকলকে’ নিয়ে নেহরু-গান্ধী একটা ভারত গড়ার কোনো কার্যকর প্রস্তাব তারা করতেই পারেননি কখনো। কারণ তারা প্রস্তাব করেছিলেনÑ ধর্মই কথিত জাতি ধারণার মূল ভিত্তি, এটা ধরে নিয়ে একটা হিন্দু-নেশন স্টেট গড়তে প্রস্তাব করে যাচ্ছিলেন। বাস্তবে এটা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। এখান থেকেই আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ার দাবি ওঠে এবং এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল। তবে এর আগে সর্বশেষ প্রস্তাবটা ছিল ১৯২৮ সালে। জিন্নাহর ‘চৌদ্দ দফা’য় তিনি প্রদেশগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে এরপর ফেডারেল আমেরিকার মতো প্রদেশগুলোর এক অখণ্ড ‘কনফেডারেটেট ইন্ডিয়া’ গড়ার দাবি তুলেছিলেন। বলাই বাহুল্য, নেহরু-গান্ধী জিন্নাহর এহেন প্রস্তাব বাতিল করে দিয়েছিলেন। প্রস্তাব বাতিল করে দেয়া সহজ কাজ। কিন্তু এর অর্থ যে, পরিস্থিতিকে দাঙ্গার দিকে ঠেলে দেয়া, এ দিকটা কেউ ভেবেছিলেন বলে মনে হয় না।
এত দূর পর্যন্ত চিন্তা করতে পারেননি ড. আনিসুজ্জামানরা । তিনি রাজনীতিবিদ নন বা এ বিষয়ে ভাবার উপযুক্ত ব্যক্তিও নন। এটা ব্যক্তি আনিসুজ্জামানের জন্য দোষেরও নয়। কিন্তু এটা বিরাট সমস্যা হয়ে হাজির হলো, যখন তিনি ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে রোগের এক লক্ষণকেই রোগ বলে ঠাউরে বসেন। বরং এটাই হিন্দু জমিদারের রাজনীতি ও স্বার্থের পক্ষে থাকা তা জেনে-না-জেনে খাড়া হয়ে যাওয়া অনুচিত।

কিন্তু এত শব্দ থাকতে সাম্প্রদায়িকতা, এই শব্দটাকেই তারা এত পছন্দের বিষয় করলেন কেন? এ ছাড়া তারা সময়ে আরো সামনে বাড়েন। যেমন তাদের আরেক শব্দ আছে ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ (অথবা সময়ে বলেন ‘সেকুলারিজম’), যেটা আরেক ভুয়া শব্দ এবং তা জমিদারের রাজনীতি ও স্বার্থ লুকানোর এক কৌশল।

সাম্প্রদায়িকতা শব্দটার মূল শব্দ হলো ‘সম্প্রদায়’, যেটা ইংরাজি ‘কমিউনিটি’ শব্দের অনুবাদ। তবে ‘কমিউনিটি’ শব্দটা খুবই ইতিবাচক শব্দ, কোনোভাবেই এটা ডেরোগেটেড বা নিচু-অর্থ হয় এমন শব্দ নয়। অথচ সাম্প্রদায়িকতা একটা নেতিবাচক কথা। এটা ১৮০০-১৯৪৭ এই সময়কালজুড়ে হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির বয়ান তৈরি করতে বানিয়ে নেয়া শব্দ। বাঙালি ‘জাতি’ কী, কোনটা থাকলে বাঙালি জাতি, কী এর বৈশিষ্ট্য, কোনটা ও কেমন বাংলা ‘ভাষা’ ইত্যাদি এথনিক পরিচয়গুলো ওই জমিদারি ক্ষমতার হাতে তৈরি এবং আকার, বৈশিষ্ট্য দেয়া ইত্যাদি সবই সম্পন্ন হয়েছিল তখন। এখানেই সাব্যস্ত করা ছিল- হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির রায় যে, ‘মুসলমানেরা বাঙালি নয়’। জমিদারেরা বেশির ভাগ বর্ণহিন্দু ছিলেন বলে জমিদারি সামাজিক ব্যবস্থাটা প্রচ্ছন্নভাবে হলেও ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতপ্রথারও ধারাবাহিকতা হয়ে উঠেছিল। মুসলমানরা বাঙালি সমাজেই পাশাপাশি বসবাস করতো বলে ফেলে দিতে পারেনি। তবে তাদের জাতিভেদপ্রথায় মুসলমানদের অবস্থান ছিল নমঃশূদ্র, চর্মকারদেরও দু’ধাপ নিচে। এভাবেই জমিদারি ক্ষমতার হাতেই কথিত বাঙালিয়ানা যাত্রা শুরু করেছিল, মুসলমানদের বাইরে উপেক্ষিত রেখে। কেমন করে আশা করি যে, এসব তৎপরতার কোনো চরম ব্যাকফায়ার প্রতিক্রিয়া হবে না?

এই যে সাজানো মনোরম বাগান মানে জমিদার বাবুর ‘বাঙালি সমাজ’, এতে প্রবেশ করতে গেলে মুসলমানদের ‘অনুমতি’ নিতে হবে। ঘটনাচক্রে কোনো মুসলমানকে যদি এই ‘বাঙালি সমাজ বসতে উঠতে জায়গা পেতে হতো, যেমন তত দিনে মডার্ন এডুকেশন ও সংশ্লিষ্ট চাকরি এসে গেছিল, এর সুযোগ যদি পেতে হতো তবে মুসলমানেরা প্যান্ট বা ধুতি পরতে হতো, মাথায় টুপি চাপাতে পারতেন না। মডার্নিটি নামের আড়ালে জমিদার হিন্দুর কালচার বা তাদের ঠিক করে দেয়া বৈশিষ্ট্য মুসলমানদের অনুসরণ করতেই হবে, কেন? নইলে? নইলে আপনাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ ডাকা হবে। আর মনে রাখবেন, একবার সাম্প্রদায়িক ট্যাগ লাগিয়ে দিলে ‘বাঙালি সমাজে’ আপনার প্রবেশ নিষিদ্ধ, অচল হয়ে যাবেন সেখানে। শিক্ষা, চাকরি কিছুই জোগাড় করতে না পেরে এখন না খেয়ে মরেন, আপনি!

তাহলে ‘অসাম্প্রদায়িক’ হওয়া মানে কী? জমিদারির আধিপত্যে সাজানো ‘বাঙালি সমাজে’ প্রবেশ ওঠা-বসার সুযোগ ও অধিকার পেতে হলে শাসক জমিদার বাবুর নির্ধারিত যে কোড আপনাকে মেনে চলতে হতো, অভ্যস্ত হতে হতো, এটাই ‘অসাম্প্রদায়িকতা’। আবার অসাম্প্রদায়িকতার ট্রেনিং ও ওরিয়েন্টেশন শেষে ওই সমাজে প্রবেশ করতে পারলে ভেবেন না আপনি তখন বাঙালিও হয়েছেন। আপনি সেই তখন বড় জোর বাঙালির এক পড়শি কেবল। অনেকের মনে আছে হয়তো রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী মিতা হকের এক টকশো ক্লিপ পাওয়া যায় ইউটিউবে, সেখানে বাঙালি মেয়ে কারা তা নিয়ে মিতা হকের দেয়া এর বর্ণনা আছে। তিনি সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। সেটি মিলিয়ে দেখতে পারেন, তাতে আমার কথা আরো ভালো বোঝা যেতে পারে। কেউ বাঙালি কি না এর সবচেয়ে সহজ পরীক্ষা হলো, সে তার মায়ের সাথে কী ভাষায় কথা বলে, কিভাবে ডাকে ইত্যাদি। তার ধর্ম বা পোশাক ইত্যাদিতে একধরনের লাইন টেনে দিতে চায় জমিদার কর্তৃক নির্ধারিত অসাম্প্রদায়িকতার কোড। নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে। সেটি কি ব্যাকফায়ার করবে না? আসলে ‘মাদার টাঙ’ তো লুকানো যায় না, ভোলা যায় না।

জমিদারির হিন্দু কালচার বোঝাতে চায়, তারা তাদের বাঙালি সমাজ বলে এক বাগান সাজিয়েছে। সেখানে তাদের কোডের বাইরে আলাদা পোশাক বা আচার হাজির করা মানে তাদের সম্প্রদায়ের সেটআপের মধ্যে মুসলমান সম্প্রদায়েরও চিহ্ন দেখিয়ে মাথা তুলতে চাওয়া। তাদের সাজানো বাগানে অন্যরাই যেন হস্তক্ষেপ করছে।
সেই জমিদার শ্রেণীর আধিপত্যে ও নেতার হাতে চালু করা সমাজ আজও একইভাবে চলছে। আর পশ্চিম বাংলার মুসলমানরা আজো ‘অসাম্প্রদায়িক’ চিহ্ন রপ্ত করতে করতে একেবারে ট্রেইন্ড। কারণ সে জানে এটাই এখনো তার পাসপোর্ট, না হলে বাঙালি সমাজে উঠতে দেয়া হবে না।

আনিসুজ্জামান সম্ভবত ‘কলকাতার মুসলমান’ হিসেবে ছোট থেকেই কথিত ‘অসাম্প্রদায়িক’ হয়ে উঠতে ট্রেইন্ড। তার মনে অজানা ভয় কাজ করেছে যে, গোষ্ঠী বিশেষের আধিপত্যের তৈরি করা কোনো গাইড লাইন বা কোড ভঙ্গ করে কোথায় না অপমানিত হতে হয়। মজার কথা হলো, কলকাতার মুসলমান যখন পূর্ব-পাকিস্তানে বা বাংলাদেশে স্থায়ী বসবাসের জন্য চলে আসেন, তখনো তাদের ‘ট্রমা’ যায় না। উল্টো তারা বাংলাদেশের মুসলমানদের ওই একই ধরনের ‘অসাম্প্রদায়িক’ হতে সবক দিয়ে বসেন।

কোনো মডার্ন ভ্যালু বা ইন্ডিভিজুয়ালিজম যদি চর্চা করতে হয় তো করুন। তবে বুঝে শুনে করুন, মন লাগিয়ে। কিন্তু পুরানা জমিদার বা সামন্ত আধিপত্যের ভ্যালুর জোয়াল কাঁধে নিয়ে ঘোরা তো একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। কেবল খেয়াল রাখবেন, সহনাগরিক কারো অধিকার লঙ্ঘন করে যেন না বসেন, পায়ে মাড়াবেন না তাদের। কারণ তারাও আপনারই সমান; তাদেরও বৈষম্যহীন অধিকার আছে। এটা খুবই শক্তভাবে মেনে চললে ভুয়া কথাবার্তার কবল থেকে রেহাই পেয়ে যেতে পারেন।

বাঙালি মুসলমান তা সে যেখানকারই হোক, তার আর কারো কাছ থেকে সে ‘বাঙালি’ কি না, এই স্বীকৃতি অপ্রয়োজনীয়। পুরানা জমিদার গোষ্ঠীর আধিপত্যের কোনো কিছুকে সে আর গুরুত্ব দেয় না বিশেষত ৪৭ সালের পর থেকে। কারণ পাকিস্তান কায়েমের পরই পুরা দেশ থেকেই জমিদারি উৎখাত করে হয়েছে। তাই এই পরাস্ত স্ট্যাটাস আর তাকে কাউকে বাঙালি সনদ দেবার-না- দেবার কোনো মুরোদ রাখে না। তবে ওই জমিদার ও তার স্বধর্মী সঙ্গীরাই এখন সব ক্ষমতা আর আধিপত্য হারালেও বাম ভেক নিয়ে নতুন করে হাজির আছে। তারা মাঝে মাঝে তাকে কথিত সেকুলার, অসাম্প্রদায়িকতা শেখানোর চেষ্টা করে।

কিন্তু বাঙালিয়ানা? না সে মুরোদ বা বাস্তবতা আর নেই। কারণ ইতোমধ্যে ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে প্রধানত মুসলমান বাঙালি প্রমাণ করে রেখেছে যে, নিজের বাঙালি স্বীকৃতি আর অপরের কাছে নয়, নিজেই নিজের বাঙালি স্বীকৃতি, নিজেই তা হাসিল করে নিয়েছে।

কলকাতায় বড় হওয়া মুসলমানরা এখনো এক ট্রমায় ভুগছেন। যেমন মনে করুন, ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাসে বাংলাদেশের অনেক বন্ধু মিলে কোনো আলাপ করছেন। সেখানে নিজেদের মধ্যে কারো কোনো অসাম্য বা নিচু বোধ নেই, যা বলতে ও লিখতে ইচ্ছা করছে, করছেন। আপনারই কোনো কলকাতাই মুসলমান বন্ধু এসে গেছে সেখানে। সে আপনার সাহস ও মর্যাদাবোধ দেখে তো কাঁপছে আর হয়তো বারবার আপনাকে, সেকুলার বা অসাম্প্রদায়িক থাকতে পরামর্শ দিচ্ছে, জামা টেনে ধরছে। তাহলে বুঝতে হবে, কলকাতায় থাকতে থাকতে এটা আপনার বন্ধুর ট্রমাÑ কোড মেনে চলার ট্রমা।

গৌতম দাস
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক