যেভাবে পাকিস্তানের বড় ধরনের ক্ষ’তি করলেন মাওলানা ফজলুর

0
11

মাওলানা ফজলুর রহমানের দুর্ভাগ্যপীড়িত আজাদি-মার্চ কানা গলিতে উপনীত হয়েছে। তিনি যে আলটিমেটাম দিয়েছিলেন, তার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ নিয়ে তার দাবি পূরণ হয়নি এবং হওয়ার সম্ভাবনাও নেই।

অধিকন্তু এই উদ্যোগে তার অংশীদারেরা (পিপিপি ও পিএমএল-এন) তাদের সমর্থন থেকে সরে গিয়ে এই ইঙ্গিতই দিয়েছে যে তারা মাওলানার দ্বিতীয় ধাপের আন্দোলন তথা তার উচ্ছৃঙ্খল সমর্থকদের রেড জোনে মার্চ করতে যাওয়ার পরিকল্পনার সাথে নেই।

এই সরে যাওয়াটা বিস্ময়কর কিছু নয়। কারণ তিন দলের মধ্যে অভিন্ন তেমন কিছুই নেই। একটি মাত্র বিষয়ই তাদের মধ্যে সমঝোতা রয়েছে এবং তা হলো নিজেদের ক্ষমতা দখলের জন্য বর্তমান সরকারকে হটাতে হবে।

অন্যদিকে বেশির ভাগ ব্যাপারেই তাদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। মাওলানা যেখানে ইসলামি রাষ্ট্র চান, তখন পিপিপি ও পিএমএল (এন) বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাটির পরিবর্তন চায় না।

আরেকটি মতানৈক্যের বিষয় হলো ধর্ম ও মাদরাসার ভূমিকা নিয়ে। মাওলানার প্রয়োজন, এগুলো বর্তমানের মতোই চলুক, যাতে তিনি ইসলামি চরমপন্থা প্রচার করতে পারেন।

কিন্তু এ ব্যাপারে অন্য দুই দল তাকে সমর্থন করে না। তারা মনে করে, মাদরাসাব্যবস্থায় পরিবর্তন প্রয়োজন, যাতে চরমপন্থার প্রকোপ হ্রাস করা যায়।

এই দল দুটি বরং চায় পাকিস্তানি তরুণরা যাতে জ্ঞানার্জন করে দেশকে এগিয়ে নেয়ার মতো সক্ষম হয়। ফলে বিরোধী দলগুলোর মধ্যকার রাজনৈতিক সমর্থন সীমিত এবং মাওলানা একা ওই স্রোত থামাতে পারেন না।

তাহলে তিনি এখন কোথায় যাবেন? ডি-চক তার হাতের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় তাকে মুখ রক্ষার জন্য কিছু করতে হবে। সরকার সম্ভবত এখন তাকে মুখ রক্ষার জন্য কিছু একটা দেবে।

আর ফজলুর রহমান পরবর্তী ধাপ সম্পর্কে আলোচনার জন্য পিপিপি ও পিএমএল (এন) দলের নেতাদের তলব করেছেন। কিন্তু তারা আসছে না। সরকার, পিপিপি ও পিএমএল (এন) চিন্তা করছে কিভাবে তাদের সদস্য ও সমর্থকদের নিঃসঙ্গ না করেই কী করা যায়। আগামী কয়েক দিনে বুঝা যাবে, কী হতে পারে।

ফজলুর রহমান বুধবার তার বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন যে তিনি তার আন্দোলনকে পুরো পাকিস্তানে সম্প্রসারণ করে একে জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করবেন। হ্যাঁ, তিনি একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ এবং এখন পর্যন্ত তিনি হুমকি প্রদানে কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন।

গত নির্বাচনে তিনি ও তার দল যে শোচনীয় অবস্থায় পড়েছিলো, তা থেকে কিছুটা হলেও ভালো অবস্থায় আসতে চান। আর ফজলুর রহমান নিজে পেছনের দরজার আলোচনার একজন ঝানু লোক। তবে তিনি জানেন, তিনি যা চান, তা হাসিল করতে হলে অন্য দুই দলের সমর্থন প্রয়োজন।

যাই হোক, ফজলুর রহমান কী পাবেন বা আদৌ পাবেন কিনা ওই হিসাব স্থগিত রেখে দেখা যাক এই পর্যায়ে কী শিক্ষাটি গ্রহণ করা যেতে পারে।

প্রথমত, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ মাওলানার দাবিগুলোর মধ্যে কয়েকটি অর্থনৈতিক ইস্যু-সংবলিত হলেও সেগুলোর কোনোটিই তার মার্চের মাধ্যমে তিনি সমাধান করতে পারবেন না।

তিনি এক বক্তৃতায় দাবি করেছেন যে দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তিনি লোকজনকে স্বস্তির ব্যবস্থা না করে রাজধানীতে লোকজন জড়ো করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রাই নষ্ট করে দিয়েছেন। এটা কি রাজনৈতিক শুভ বুদ্ধির পরিচয়?

দ্বিতীয়ত, বিশৃঙ্খল অনুসারীদের রাজধানীতে নিয়ে এসে আন্তর্জাতিকভাবে মোল্লাদের কোনো ইমেজ তিনি নির্মাণ করতে চাইছেন? পাকিস্তানের ভয়াবহভাবে বিদেশী বিনিয়োগ প্রয়াজন।

হাজার হাজার লোক রাস্তা অবরোধ করে রাজধানীকে অচল করে দিয়ে কি তিনি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে পারবেন? যেখানে প্রয়োজন স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ, সেখানে তিনি অস্থিরতাই সৃষ্টি করছেন।

তৃতীয়ত, ইসলামাবাদের এইচ-৯-এ হওয়া নাটকটি দেশের মনোযোগ সরিয়ে নিচ্ছে। ভারত-অধিকৃত কাশ্মীর যখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, তখন কিভাবে কিছু লোক আরো বেশি জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন ধীরে ধীরে কাশ্মীরের দিকে নজর ফেরাচ্ছে, তখন পাকিস্তানেই তারা গোলযোগ সৃষ্টি করছেন। মোল্লাদের এই মার্চের ফলে যে নেতিবাচক ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সৃষ্টি হবে, তাকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। তাছাড়া মোল্লাদের মার্চ আর জঙ্গি বক্তৃতার ফলে পাকিস্তান জঙ্গিবাদ ছড়াচ্ছে বলে ভারত যে প্রচারণা চালাচ্ছে, সেটাই আরো গতিবেগ পাবে।

বর্তমান আন্দোলনের স্থায়িত্ব ও ফলাফল এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। তবে এটা যে অনেক দিক থেকেই পাকিস্তানের জন্য ক্ষতিকারক হবে, পাকিস্তানের কোনো সমস্যারই সমধান করতে পারবে না, তা নিশ্চিত।

এই বিক্ষোভে জড়িত রাজনীতিবিদদের দিকে তাকালে সহজেই বোঝা যাবে যে তারা চরমভাবে স্বার্থপর। মোটামুটিভাবে অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে হওয়া একটি নির্বাচন বাতিলের জন্যই তারা এই আন্দোলন করছেন। আসলে আজাদি-মার্চের আসল লক্ষ্য ক্ষমতা দখল ও আগে ক্ষমতায় থাকার সময়কার লুণ্ঠিত সামগ্রীর দখল বজায় রাখা। গণতন্ত্রের কী বিশ্রি ছবি!

লেখক: প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক