রাষ্ট্রপ্রধান মিথ্যাবাদী হলে জনগণের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে: রনি

0
596

রাজনীতির চাটুকারেরা যদি কোনো মিথ্যাবাদী রাজাকে নিজেদের কুমর্মের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পেয়ে যান, তবে তারা সেটিকে এক পরম সৌভাগ্য বলে মনে করতে থাকেন।

তখন চাটুকারেরা শত হস্তে, শত পদে এবং শত মুখে রাজার কুকর্মগুলোকে রাজ্যময় আবাদ করতে শুরু করে দেন। কুকর্মের বাহারি ব্যঞ্জনে আপ্যায়িত করে এক দিকে যেমন নিজেদের বংশ বৃদ্ধি করতে থাকেন, তেমনি মিথ্যাবাদী রাজাকে টানতে টানতে একেবারে জাহান্নামের সদর দরজায় নিয়ে জাহান্নামের রক্ষীদের কাছে হস্তান্তর না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হন না। রাজনীতির চাটুকারেরা কেবল মিথ্যাচার কিংবা চাটুকারিতার মধ্যে নিজেদের কুকর্ম সীমাবদ্ধ রাখেন না

তারা রাষ্ট্রশক্তির সব হাতিয়ার, সুযোগ-সুবিধা এবং সুনাম-সুখ্যাতি ব্যবহার করে অন্তহীনভাবে জুলুম-অত্যাচার, খুন-জখম, চুরি-ডাকাতি-রাহাজানি করতে থাকেন।

তারা নিজেদের মধ্যকার পাশবিক সত্তাকে বের করে আনেন এবং সেই পাশবিক শক্তির ওপর সওয়ার হয়ে পুরো জমিনে তাণ্ডব চালাতে থাকেন। তারা কেবল মিথ্যাবাদী রাজার স্বার্থ দেখেন- রাজাকে ভয় করেন এবং তাকে খুশি করার জন্য চাটুকারিতার নিত্যনতুন মহাকাব্য রচনা করেন।

মিথ্যাবাদী শাসক এমনিতেই নিজের কুকর্মের কারণে অন্ধ, বধির ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত প্রাণীদের মতো নির্জীব হয়ে পড়েন। ফলে চাটুকারদের তাণ্ডব, ছলচাতুরী, জুলুম-অত্যাচার এবং শয়তানি ফন্দি-ফিকির ছাড়া মিথ্যাবাদী শাসকদের কোনো গত্যন্তর থাকে না। বাইরের দুনিয়ার মানুষ মিথ্যাবাদী শাসককে যতই শক্তিশালী ভাবুক না কেন- তিনি আসলে চাটুকারদের হাতের পুতুল ছাড়া অন্য কিছু নন।

রাজ্য-রাজা-রাজনীতিকেন্দ্রিক মিথ্যাচার ও চাটুকারিতার উল্লেখিত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমরা কমবেশি সবাই জানি এবং এসব জানার জন্য খুব বেশি পাণ্ডিত্য অথবা গবেষণার দরকার নেই।

কাজেই আল বিরুনির মতো যুগশ্রেষ্ঠ মহামানব তার অমূল্য গ্রন্থ ভারততত্ত্বে রাজনীতি, মিথ্যাচার ও চাটুকারিতার সাধারণ মিথগুলো নিয়ে আলোচনা করেননি।

তিনি মিথ্যার বেসাতি ও কারণ সম্পর্কে এমন মৌলিক কিছু বিষয়ের অবতারণা করেছেন- যা ৯০০ বছর আগে রচিত হওয়া সত্ত্বেও আজো মানুষের চিন্তার খোরাক জোগাচ্ছে।

আল বিরুনি তার ভারততত্ত্ব গ্রন্থে মিথ্যাচারের জন্য পারস্পরিক সোহবত অর্থাৎ মিথ্যাবাদীদের মধ্যকার ঐক্য, সম্প্রীতি ও মেলামেশাকে দায়ী করেছেন।

তার মতে, মিথ্যাবাদীরা যদি ভালো মানুষের সঙ্গ পেত, তাহলে তাদের মিথ্যা বলার প্রবণতা কমে যেত। তিনি জনশ্রুতিকেও মিথ্যাচারের অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। লোকমুখে শোনা কথা প্রচার হতে হতে একসময় কিছু কিছু জনশ্রুতি ভয়ঙ্কর গুজবে পরিণত হয়।

কাজেই কোনো মানুষ যদি মিথ্যাকে পরিহার করতে চায়, তবে তার উচিত কোনো ঘটনা সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ঘটনা প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করা।

আল বিরুনির মতে, সংবাদদাতাদের চরিত্র, বুদ্ধিশুদ্ধি, বিচার-বিবেচনার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। অর্থাৎ প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া সত্ত্বেও অনেকে অনেক ঘটনা নির্ভুলভাবে বর্ণনা করতে পারেন না অথবা করেন না।

ব্যক্তিগত বোধবুদ্ধির অভাব অথবা ব্যক্তিগত রাগ-ক্ষোভ, লোভ-লালসা বা স্বার্থে প্ররোচিত হয়ে অনেক সংবাদদাতা মিথ্যা কথা প্রচার করে থাকেন।

কাজেই কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য বিশ্বাস করার আগে সংশ্লিষ্ট লোকটির স্বভাব-চরিত্র, স্থান-কাল-পাত্র ইত্যাদি বিবেচনা করেই তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা উচিত এবং সেই সাক্ষ্যকে নিজের বক্তব্য বলে প্রচার করার ব্যাপারে সতর্ক থাকা একান্ত অবশ্যক।লেখক : গোলাম মাওলা রনি, সাবেক সংসদ সদস্য. উৎসঃ নয়াদিগন্ত