1. [email protected] : BD News : BD News
  2. [email protected] : Breaking News : Breaking News
বিজিবিতে এসে আমি আজিজ স্যারকে সত্যিকার ভাবে চিনতে পারি, গল্পটি চমকপ্রদ: মুস্তাফিজ | News12
January 21, 2022, 2:08 am

বিজিবিতে এসে আমি আজিজ স্যারকে সত্যিকার ভাবে চিনতে পারি, গল্পটি চমকপ্রদ: মুস্তাফিজ

Staff Reporter
  • Update Time : Sunday, January 9, 2022
  • 186 Time View

জেনারেল আজিজ আহমেদ, বাংলাদেশের সাবেক সেনা প্রধান।ছিলেন এই আজিজ আহমেদ। তবে একটা সময়ে এই নামটি ছিল বেশ গৌরবের। কিন্তু সম্প্রতি সময়ে এই নামটি নিয়েই হচ্ছে বেশ আলোচনা সমালোচনা। আর এই কারনেই তাকে নিয়ে এখন হচ্ছে অনেক বেশি লেখালেখি। বিশেষ করে তাকে নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন অনেক সাবেক সেনা ও বিজিবি কর্মকর্তারাও। সম্প্রতি এ নিয়ে একটি ধারাবাহিক লেখনি লিখে যাচ্ছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মুস্তাফিজুর রহমান।পাঠকদের উদ্দেশে তার সেই লেখনি তৃতীয় অংশ তুলে ধরা হলো হুবহু:-

জেনারেল আজিজ পর্ব-৩

অতি সাধারণ পরিবারের একজন মিডিওকার সেনা কর্মকর্তার তরতরিয়ে ওপরে ওঠার গল্পটি চমকপ্রদ। এ যেন এক ক্ষুদ্র, গৃহপালিত, চতুষ্পদী ক্রিয়েচার থেকে রাতারাতি বিগ ক্যাট হয়ে ওঠার কাহিনী। সীমাহীন ক্ষমতার লোভ, দূর্নীতি, পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব, কুশিক্ষা আর চাটুকারিতাকে সম্বল করে জেনারেল আজিজ আর তার রকবাজ ভাইদের উত্থান হিন্দী মুভির কাহিনীকেও হার মানায়। তার তিনভাই গলির গুন্ডা হলেও আজিজ স্যার লেখাপড়ায় ভাইদের তুলনায় ভাল হওয়ায় সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে পেরেছিলেন। সময়ের আবর্তে তার ক্যারিয়ারে ডালাপালা মেলার সাথে সাথে তার অপকর্মের পরিধিও আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি করে হয়ে যান পরিবারের মাথা। ডন কর্লিওনি যেমন তার পরিবারকে সব সময় আগলে রাখতেন ঠিক তেমনি তার ভাই ব্রাদার থেকে শুরু করে তার অনুগত অফিসারদের আগলে রাখতেন মাফিয়া স্ট্যাইলেই!

জেনারেল আজিজ কথাবার্তায় আনইপ্রেসিভ হলেও তিনি হিউম্যান সাইকোলজি বুঝেন ভাল। কোন অফিসারকে দিয়ে কোন কাজ হবে, কোথায় সৎ অফিসারদের ব্যবহার করতে হবে আর কোথায় অনুগত (দেশের প্রতি অনুগত নয়) অফিসারদের নিয়োগ দিতে হবে এ বিষয়ে স্যারের প্রজ্ঞা তুলনাহীন।

এখানে বলে রাখা ভাল যে, আনুগত্যের পরীক্ষা নয় আমার সততা এবং নিয়মনিষ্ঠ আচরণের জন্য আমি জেনারেলের সুনজরে পড়ে যাই।

জেনারেল আজিজ স্যারকে আমি গভীরভাবে বুঝতে শুরু করি বিজিবিতে আমার পোস্টিং আসার পর। তিনি তার বিশ্বস্ত অফিসারদের তার আশেপাশে কয়েকটি বলয়ে ভাগ করে রাখতেন। কোন অফিসারকে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে কোন সুবিধাটা আদায় করা যাবে আর কাকে আওয়ামী বিরোধীদের মিছিলে গুলিবর্ষণ করে সায়েস্তা করা যাবে কিংবা কাদের দিয়ে তার ভাইদের বিজিবি রিক্রুটিং অফিসারের মাধ্যমে নিয়োগ বানিজ্য করা যাবে এ বিষয়ে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। জেনারেল আজিজ তার এই দক্ষতার প্রমাণ দেন তিনি ডিজি বিজিবি হয়ে স্হানীয় নির্বাচন গুলোর আগে ও পরে বিরোধীদল দমনে। উল্লেখ্য যে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে তার অতি বিশ্বস্ত অফিসারদের দিয়ে সারা দেশে মাত্র ৩০,০০০ সেনা সদস্য মোতায়ন করেন তিনি। অথচ এই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য দরকার ছিল ৮০,০০০ +- (যে কোন সংসদ নির্বাচনে সাধারণত এই সংখ্যক সৈন্য মোতায়ন হত) সেনা। ২০১৮ সালের পাতানো নির্বাচনের গল্প আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই। জেনারেল আজিজ তার আনুগত্যের হট সিটে বসা তখন। এই স্বল্প সংখ্যক সৈন্যদের তিনি নিজে নিয়মকানুন তৈরী করে ভোট কেন্দ্র থেকে দূরে রাখেন। আজিজ গংদের মাস্তানি আর পদলেহনের কারণে আমরা পেয়েছি এই স্বৈরাচারী সরকারকে!

এবার আসা যাক, জেনারেলের সাথে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা। স্যার সম্ভবত প্রথমে আমাকে বাই নেইম চিনতে পারেন যখন তিনি মিরপুর সেনানিবাসে একটি আর্টিলারি ব্রিগেডের কমান্ডার। ২০১১ সাল ছিল। পদবীতে তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, আর আমি ছিলাম ঢাকা সেনানিবাসে মেজর র‍্যাংকে একটি গোয়েন্দা সংস্হার ঢাকা শাখার অধিনায়ক। স্যারের সাথে আমার তৎকালীন অধিনায়কের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভাল ছিল বিধায় আমার অধিনায়কের অফিসে এবং তার বাইরেও বেশ কয়েকবার দেখা হয় এবং সৌজন্য বিনিময় হয়। গোয়েন্দা সংস্হার অধিনায়ক হিসাবে স্যারের পরিবারিক/প্রফেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড আমি বিস্তারিত জানতাম।

২০১১ সালের অক্টোবরে আমি পদোন্নতি পেয়ে ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক হিসাবে জয়েন করার কিছুদিন পর তিনি কুমিল্লা ডিভিশনের জিওসি হিসাবে যোগদান করেন। ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ান অপারেশনালি সেনাসদরের অধিনস্ত হলেও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের অধিনস্ত ছিল। তিনি জিওসি হিসাবে দ্বায়িত্ব নেবার পর সিলেটে আসেন আমাদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত এবং তার কমান্ড ডাইরেক্টিভস্ দেবার জন্য। তিনি তার প্রথম দরবারে রেগুলার নির্দেশনার সাথে প্রথমেই শুরু করেন সৈনিকদের কী কী সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে তার বিশাল ফিরিস্তি দিয়ে~ যা অধিনায়কদের মেনে নিতে কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু তিনি সৈনিকদের থেকে কী আশা করেন বা তাদের প্রশিক্ষণে কী মান বজায় রাখতে হবে তা না বলে পাশ কাটিয়ে গেলেন। ডিভিশনের প্রশিক্ষণ গোল কী? এ বিষয়ে এক লাইন বলে তিনি বক্তব্য শেষ করে দিলেন। আমরা সবাই বুঝে গেলাম নতুন জিওসির প্রায়োরিটি! সিনিয়র অফিসাররা সৈনিকদের ওয়েলফেয়ারের ব্যাপারে দিলদরিয়া হবেন এটা খুবই স্বাভাবিক কিন্তু প্রশিক্ষণ আর প্রশাসনিক বিষয় উপেক্ষা করে নয়। সেনাবাহিনীর মূল মন্ত্র হচ্ছে “কঠিন প্রশিক্ষণ সহজ যুদ্ধ”! আমি বরাবরই দেখে এসেছি জিওসি থেকে অধিনায়ক পর্যন্ত সবাই তার কমান্ড ডাইরেক্টিভস দেবার সময় প্রশিক্ষণের প্রতি জোর দেন। আজিজ স্যার সস্তা জনপ্রিয়তা আর হাততালি পাবার আশায় প্রশিক্ষণ কম্প্রেমাইজ করলেন। এই দরবারের পর আমি সহ সকল অধিনায়করা এ বিষয়ে অসেন্তোষ প্রকাশ করেছিলাম। কয়েকজন ঠোঁটকাটা অফিসার তার পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড এবং অপেশাদার সামরিক ক্যারিয়ার নিয়ে নীরবে আক্ষেপ করেন।

আমার ব্যাটালিয়ান সরাসরি সেনাসদরের অপারেশনাল কমান্ডে থাকায় জেনারেল আজিজের অতি-ওয়েলফেয়ার আর সহজ (যেটা আসলে সুকঠিন হবার কথা) প্রশিক্ষণ নীতিমালা কমান্ডোদের স্পর্শ করতে পারেনি। জেনারেল আজিজের সময় প্রশিক্ষণের উপর চাপ কমে যাওয়ায় একদা চাইনিজ ডিভিশনখ্যাত কুমিল্লা ডিভিশনের (বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অন্যান্য ডিভিশন থেকে কুমিল্লা ডিভিশনের প্রশিক্ষণের মান বরাবর কঠোর হওয়ায় সবাই এটাকে চাইনিজ ডিভিশন ডাকা হতো) প্রশিক্ষণের মান ধীরে ধীরে নামতে থাকে। এভাবে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি প্রশিক্ষিত আর্মি থেকে ধীরে ধীরে নখদন্তহীন সেনাবাহিনীতে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া শুরু করেন।

উপরোক্ত দরবারের কিছুদিন পর জেনারেল আজিজ ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়ন পরিদর্শনে আসেন। আমি তখন কমান্ডো ব্যাটালিয়নের সদস্যদের লাইভ ফায়ার দিয়ে প্রশিক্ষণের জন্য ওপেন শ্যুট হাউজ বা কিল হাউজ এবং একটি মাল্টি-পারপাজ ইনডোর শ্যুটিং কমপ্লেক্স তৈরী করছিলাম। ওপেন শ্যুট হাউজটি তৈরী ছিল। স্যার ব্যাটালিয়নে এলে প্রথমে আমরা স্যারকে কমান্ডো ব্যাটালিয়নের ঐতিহ্য অনুযায়ী তাকে কমান্ডো ব্যারেট ও নাইফ পরিয়ে দেই। স্যার এই সম্মান পেয়ে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন এবং তার কমান্ড ফান্ড থেকে কমান্ডো ব্যাটালিয়ানকে বেশ বড় অংকের অর্থ মঞ্জুর করেন। পরবর্তীতে তিনি আমাদের শ্যুট হাউজে একটি কাউন্টার টেররিজম জিম্মি উদ্ধার অভিযান উপভোগ করেন এবং মাল্টি-পারপাজ ইনডোর শ্যুটিং কমপ্লেক্সের সাইট পরিদর্শন করেন এবং ব্রিফিং শোনেন।

২০১২ সালে জেনারেল আজিজ ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নের Fitness for war পরিদর্শনে আসেন। তার পরিদর্শন দল এই ইউনিট সরাসরি সেনাসদরের অপারেশনাল কমান্ডে হওয়ায় শুরুতে কঠোরভাবে পরিদর্শন পরিচালনা করলেও সাধারণ ইউনিটের সাথে আমাদের ফায়ারিং এবং ফিজিক্যাল পারফরমেন্সের মান দেখে তিনি অভিভূত হন। তিনি আমাদের বছরের প্রথম তিন মাসে এম্যুনিশন এক্সপেন্ডিচার ১ লক্ষ ৩৫ হাজার দেখে আমাদের প্রশিক্ষণের মান বুঝতে পেরে পুরো রিল্যাক্স মুডে চলে যান এবং পরবর্তীতে তার সন্তানদের সহ আমাদের বিমানে, বাসে এবং শ্যুট হাউজে (লাইভ এম্যুনিশন ফায়ারিং) কাউন্টার টেররিজম প্রশিক্ষণ পরিদর্শন করেন।

এছাড়া আমাদের অগ্নি নির্বাপন, বিল্ডিং ক্লাইম্বিং, নাইফ থ্রোয়িং এসব প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক ইকুইপমেন্ট দেখে তিনি আমাদের প্রশিক্ষণের মান নিয়ে পরিদর্শন দলের কাছে ভূয়াসী প্রশংসা করেন। সবশেষে না বললেই নয় যে, আমরা কুমিল্লা ডিভিশনের সকল ইউনিটের মধ্যে ‘ফিটনেস ফর ওয়ার’ এ প্রথম স্হান অধিকার করি।
২০১৫ সালে বিজিবিতে পোস্টিং হয় আমার। বিজিবিতে এসে আমি জেনারেল আজিজ স্যারকে সত্যিকার ভাবে চিনতে পারি!চলবে……
প্রসঙ্গত, জেনারেল আজিজ আহমেদ সম্প্রতি বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে সব থেকে বেশি আলোচনায় রয়েছেন তিনি। বিশেষ করে তার সম্প্রতি দেয়া একটি সাক্ষাতকার নিয়ে শুরু হয়েছে অনেক বেশি সমালোচনা। তবে এখনো দেশের বাইরে রয়েছেন তিনি। জানা গেছে তার ছেলের চিকিৎসার জন্য তিনি রয়েছেন দুবাইতে। চিকিৎসা সম্পন্ন হলে তিনি চলে আসবেন দেশে।

Please Share This Post in Your Social Media

Comments are closed.

Releted
কপিরাইট : সর্বস্বর্ত সংরক্ষিত (c) ২০২২
Develper By ITSadik.Xyz