ফরিদপুরে স্বতন্ত্র প্রার্থী মজিবুর রহমান চৌধুরীর কাছে আবার ধরাশায়ী হলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ। নির্বাচনে কাজী জাফর উল্যাহ ৪৯ হাজার ৯৪৫ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। ২০১৪ সালে কাজী জাফর উল্যাহ ২৬ হাজার ৫২ ভোটের ব্যাবধানে মজিবুর রহমানের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। এ বছর সে ব্যবধান আরও বেড়েছে।

ফরিদপুর-৪ সংসদীয় আসনটি ভাঙ্গা ও চরভদ্রাসন উপজেলা এবং কৃষ্ণপুর ইউনিয়ন ব্যতীত সদরপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত। পাঁচ বছর আগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে কাজী জাফর উল্যাহকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করেছিলেন ‘বহিরাগত’ মজিবুর রহমান। সে সময় মজিবুর রহমান পাশের মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। অবশ্য ওই নির্বাচনে বিজয়ের পর তিনি ভাঙ্গার আজিমপুর ইউনিয়নের ব্রাহ্মণপাড়া গ্রামে জমি কিনে বাড়ি বানান। ওই নির্বাচনে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী মজিবুরকে ভোট দিয়েছিলেন নৌকার মাঝি পরিবর্তনের জন্য। মজিবুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিকটাত্মীয় (বঙ্গবন্ধুর ভাগনে ইলিয়াস চৌধুরীর ছেলে)। তিনি বিজয়ী হলে এ আসনটি আওয়ামী লীগের কবজায় থাকবে বলে আশা করেছিলেন এলাকাবাসী। কিন্তু গত পাঁচ বছরে আওয়ামী লীগে যোগ দেননি মজিবুর রহমান। তিনি তাঁর নিজস্ব স্বতন্ত্র সত্তা অক্ষুণ্ন রেখে চলেছেন।



ওই সংসদীয় আসনের অন্তত ১৪ জন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বিষয়টি এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় পুঁজি করেছিলেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী কাজী জাফর উল্যাহ ও তাঁর সমর্থকেরা। তাঁদের দাবি ছিল, স্বতন্ত্র সাংসদ গত পাঁচ বছরেও নৌকার মাঝি হতে পারেননি। তিনি নৌকার মাঝি হবেন প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণকে ধোঁকা দিয়েছেন। এবার নির্বাচনে তাঁকে (মজিবুর) প্রত্যাখ্যান করবে এলাকার জনগণ। এর সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের আশা ছিল, ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। ওই নির্বাচনে বিএনপির ভোট পেয়েছিলেন মজিবুর। এবার বিএনপি প্রার্থী দিয়েছে এবং তারা যে ভোট পাবে, তা মজিবুরের ভোট থেকে বিয়োগ হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এবারের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী খন্দকার ইকবাল হোসেন ১২ হাজার ৩৮০ ভোট পেলেও কাজী জাফর উল্যাহর পরাজয়ের ব্যবধান না কমে বরং বেড়ে গেছে।

জানতে চাইলে ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার বালিয়াডাঙ্গি গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সবুর কাজল বলেন, মজিবুরের আবার জিতে আসার কারণ হলো, তিনি তৃণমূলের মানুষের দোরগোড়ায় যেতে পেরেছিলেন। তৃণমূলের লোকজন দল দেখেনি, দেখেছে ব্যক্তি মজিবুরকে। পক্ষান্তরে কাজী জাফর উল্যাহ তৃণমূলের সঙ্গে মিশতে পারেন না বলে এলাকায় বদনাম রযেছে।

সদরপুর উপজেলার পূর্ব শ্যামপুর গ্রামের বাসিন্দা সাব্বির হাসান বলেন, এ এলাকার সাধারণ মানুষ সাংসদ কী জিনিস, তা বুঝত না। মজিবুর রহমান আসার পর সাংসদের কাছ থেকে মূল্যায়ন ও এলাকার উন্নয়ন পেয়েছে সাধারণ মানুষ।

এ ব্যাপারে কাজী জাফর উল্যাহ বা মজিবুর রহমানের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। কাজী জাফর উল্যাহর সমর্থক ভাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সোবাহান মুন্সী বলেন, ‘নির্বাচনী কৌশলের কাছে আমরা হেরে গেছি। সারা দেশে ভোট হয়েছে যে ফর্মুলায় ফরিদপুর-৪ আসনে ভোট হয়েছে ভিন্ন ফর্মুলায়।’ তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘এত ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পরাজয় মেনে নেওয়া যায় না। এ ফলাফল বলে দেয় নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে।’

মজিবুর রহমানের সমর্থক ভাঙ্গা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাহাদাত হোসেন বলেন, গত পাঁচ বছরে স্বতন্ত্র সাংসদ এ এলাকার মাটি ও মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পেরেছেন। তারপরও তিনি এলাকার উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রেখেছেন। জনগণ এ বিষয়গুলোই মূল্যায়ন করেছে মাত্র।



জামানত হারাবেন মওদুদসহ বিএনপির ছয় প্রার্থীই”””

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালীর ছয়টি আসনেই জামানত হারাচ্ছেন বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনই ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থী হিসেবে পরিচিত। গত রোববার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তাঁরা কেউই মোট প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ পাননি। তাই তাঁরা জামানত হারাবেন।

জামানত হারানো বিএনপির নেতারা হলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ, দুই ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান ও বরকত উল্যাহ বুলু, যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উদ্দিন খোকন এবং চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক। এ ছাড়া দলের অপর প্রার্থী ফজলুল আজিমও জামানত হারাবেন।

নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের ছয় প্রার্থীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন নোয়াখালী-৪ আসনের প্রার্থী মো. শাহজাহান, আর সবচেয়ে কম ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন নোয়াখালী-২ আসনের প্রার্থী জয়নুল আবদিন ফারুক।



শাহজাহানের সঙ্গে বিজয়ী প্রার্থী মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরীর ভোটের ব্যবধান ৩ লাখ ৭২ হাজার ৭৬৫। অন্যদিকে জয়নুল আবদিন ফারুকের সঙ্গে বিজয়ী প্রার্থী মোরশেদ আলমের ভোটের ব্যবধান ১ লাখ ৫১ হাজার ২২২ ভোট। আবার পরাজিত প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন নোয়াখালী-৩ আসনের প্রার্থী বরকত উল্যাহ বুলু। তিনি পেয়েছেন ৫৩ হাজার ৭৯০ ভোট।

জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, নোয়াখালী-১ আসনে প্রদত্ত ভোট ২ লাখ ৬১ হাজার ৩২৩। এখানে আওয়ামী লীগের এইচ এম ইব্রাহিম নৌকা প্রতীক নিয়ে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৯৭০ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির এ এম মাহবুব উদ্দিন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১৪ হাজার ৮৬২ ভোট।

নোয়াখালী-২ আসনে প্রদত্ত ভোট ২ লাখ ১৬ হাজার ৮৪৭। এখানে আওয়ামী লীগের মোরশেদ আলম নৌকা প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৩৯১ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জয়নুল আবদিন ফারুক পেয়েছেন ২৬ হাজার ১৬৯ ভোট।

নোয়াখালী-৩ আসনে প্রদত্ত ভোট ২ লাখ ৭৭ হাজার ২৪৮টি। এখানে আওয়ামী লীগের মামুনুর রশিদ কিরণ ২ লাখ ১৭ হাজার ৪২৯ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বরকত উল্যাহ বুলু পেয়েছেন ৫৩ হাজার ভোট।

নোয়াখালী-৪ আসনে মোট প্রদত্ত ভোট ৪ লাখ ৩২ হাজার ৫২৪। এখানে আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরী ৩ লাখ ৯৬ হাজার ২২ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মো. শাহজাহান পেয়েছেন ২৩ হাজার ২৫৭ ভোট।



নোয়াখালী-৫ আসনে মোট প্রদত্ত ভোট ২ লাখ ৭২ হাজার ৬২৩। এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ওবায়দুল কাদের ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৪৪ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মওদুদ আহমদ পেয়েছেন ১০ হাজার ৯৭০ ভোট।

নোয়াখালী-৬ আসনে মোট প্রদত্ত ভোট ২ লাখ ২০ হাজার ১৮৭। এখানে আওয়ামী লীগের আয়েশা ফেরদাউস ২ লাখ ১০ হাজার ১৫ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ফজলুল আজিম পেয়েছেন ৪ হাজার ৭১৫ ভোট।

রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনী আইন অনুযায়ী প্রতিটি আসনে যেসব প্রার্থী প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ ভোট পাবেন তাঁরা জামানত ফেরত পাবেন। যাঁরা তার চেয়ে কম ভোট পাবেন তাঁদের জামানত ফেরত দেওয়া হবে না। তবে তাঁরা এখনো বিষয়টি চূড়ান্ত করেননি, কারা কারা জামানত হারাবেন।

বিবেচনা করছেন কামাল, প্রত্যাখ্যান ফখরুলের””’

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের জয়ী প্রার্থীদের শপথ প্রসঙ্গে ড. কামাল হোসেন বলেছেন, বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সব ফলাফলই প্রত্যাখ্যান।

আজ সোমবার রাত সোয়া নয়টার দিকে রাজধানীর মতিঝিলে ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনের চেম্বারে জোটের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ দুই নেতা এসব কথা জানান। সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে জোটের শীর্ষ নেতারা বৈঠকে বসেন।



ঐক্যফ্রন্টের যে প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন, তাঁদের শপথ নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জোটের মুখপাত্র ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা তো ফলাফলই প্রত্যাখ্যান করেছি। সব ফলাফলই তো প্রত্যাখ্যান করা।’ তবে এ প্রশ্নের জবাবে কামাল হোসেন বলেন, ‘এগুলো আমাদের বিবেচনাধীন থাকবে, আমরা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।’

বৈঠক শেষে লিখিত বক্তব্যে কামাল হোসেন বলেন, নির্বাচনের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দাবি করেছে। পুনর্নির্বাচনের দাবিতে তাঁরা দু-এক দিনের মধ্যে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরাসহ নির্বাচন কমিশন বরাবর স্মারকলিপি দেবেন। এ ছাড়া কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

কামাল হোসেন আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও নির্বাচন কমিশন প্রহসনমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতলেও দেশের মানুষ হেরেছে এবং গণতন্ত্রের কবর রচিত হয়েছে।



বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জেএসডির আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রমুখ।

staf.news
admin@news12.us

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *