ঢাকা: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-২ আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সাবিরা সুলতানাকে বিচারিক আদালতের দেওয়া তিন বছরের সাজা ও দণ্ড স্থগিত করে আদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

বৃহস্পতিবার (২৯ নভেম্বর) বিচারপতি মো. রইস উদ্দিনের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

এ আদেশের ফলে সাবিরা সুলতানার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে আইনি বাধা থাকছে না বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী আমিনুল ইসলাম।

যদিও সাবিরা সুলতানার নির্বাচনে বাধা না থাকলেও মঙ্গলবার (২৭ নভেম্বর) এক আদেশে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ অভিমত দিয়েছিলেন, দুই বছরের বেশি দণ্ড ও সাজা হলে কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।

দুই আদালতের দুই রকম আদেশের বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘দু’দিন আগের আদেশটি হয়েছে, নির্বাচনের জন্য কেউ দণ্ড বা সাজা স্থগিত চেয়ে কোনো দরখাস্ত করে নির্বাচন করতে পারবেন না। তার কারণ, এ ধরনের প্রার্থনা সংবিধান পরিপন্থি।’

তিনি বলেন, আজ যদি আদালত এমন আদেশ দিয়ে থাকেন যে দণ্ড বা সাজা স্থগিত হলে নির্বাচন করতে পারবেন, তাহলে তো সেটি হাইকোর্টের ওই বেঞ্চের বিপরীতধর্মী আদেশ হলো। এই আদেশের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই আমরা আপিলে যাব।

আদালতে সাবেরা সুলতানার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী। তাকে সহযোগিতা করেন আমিনুল ইসলাম ও এস কে গোলাম রসুল। অন্যদিকে দুদকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এ বি এম বায়েজিদ।

পরে আইনজীবী আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাবেরা সুলতানার দণ্ড ও সাজা স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। এই আদেশের ফলে সাবেরা সুলতানা আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।’

এ আইনজীবী বলেন, ‘আজকের এই আদেশের মধ্য দিয়ে যারা দুই বছর পর্যন্ত দণ্ডপ্রাপ্ত এবং হাইকোর্টে যাদের আপিল বিচারাধীন, তারা যদি দণ্ড ও সাজা স্থগিতের আবেদন করেন এবং যদি হাইকোর্ট দণ্ড ও সাজা স্থগিত করেন, তাহলে সাবেরা সুলতানার মতো তারাও নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।’

কনভিকশন (দোষি সাব্যস্ত করা) ও সেনটেন্স (দণ্ড ও সাজা) স্থগিতের পক্ষে যুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে এই আইনজীবী বলেন, ‘আমাদের কয়েকটি জাজমেন্টসহ ১৯৯৫ সালের ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি জাজমেন্ট দেখিয়ে আমরা বলেছি, কোনো দণ্ড চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মোরাল টার্পিচুটে (নৈতিক স্খলনজনিত কারণে) কাউকে কনভিকটেড বা দোষী সাব্যস্ত বলা যাবে না। যেহেতু আপিলটি পেন্ডিং, কন্টিনিউয়েশন অব ট্রায়াল এবং যেহেতু এটি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি, সে কারণে কাউকে দণ্ডপ্রাপ্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করা অবকাশ নেই।’

আইনজীবী আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আপিল চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তির পরই একজন মানুষকে নৈতিক স্থলনজনিত কারণে দোষী সাব্যস্ত করা যায়। সে যুক্তিটিই আমরা উপস্থাপন করেছি এবং সে যুক্তির সমর্থনে আমরা দেশের ও ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জাজমেন্ট দেখিয়েছি।’

তিনি জানান, এরই প্ররিপ্রেক্ষিতে আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ ধারার ১ উপধারায় আজকে সাবেরা সুলতানার দণ্ড ও সাজা স্থগিত করেছেন।

এর আগে, মঙ্গলবার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ এক আদেশে বলেন, দুই বছরের বেশি দণ্ড ও সাজা হলে সাজা মাথায় নিয়ে কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।

এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন কোন আদেশটি অনুসরণ করবে— জানতে চাইলে আইনজীবী আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘কোর্টের আদেশের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। তবে একটি হাইকোর্ট বেঞ্চের আদেশ আরেকটি হাইকোর্ট বেঞ্চের জন্য বাইন্ডিং নয়। আজকেরে আদেশটি হয়েছে একটি জ্যেষ্ঠ (রেসপেকটিভ) বেঞ্চ থেকে।

যেহেতু আগের নজির আছে এবং সেগুলো আমরা আদালতে উপস্থাপন করেছি, তার পরিপ্রেক্ষিতেই আদালত আদেশ দিয়েছেন। ফলে নির্বাচন কমিশনসহ অধস্তন সব আদালতের জন্য তা মানতে বাধ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।’

হাইকোর্টের আগের আদেশটি তো আপিল বিভাগ স্থগিত করেনি বা বাতিল করেনি। তাহলে নির্বাচন কমিশন কোনটা মানবে— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা তো জ্যেষ্ঠ বেঞ্চের আদেশ (রেসপেকটিভ অর্ডার)। সুতরাং রেসপেকটিভ জাজমেন্ট নির্বাচন কমিশন মানতে বাধ্য।’

আপিলে বিভাগে না যাওয়া পর্যন্ত সাবিরা সুলতানার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ আছে কি না— জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘এই আদেশ দিয়েও যদি কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায়, আর আপিল বিভাগ যদি সেটা বাতিল (সেটেসাইড) করে, তখন তার সে অধিকার থাকবে না।’

আপিল বিভাগ বাতিল না করা পর্যন্ত এই অধিকার বলবৎ থাকে কি না— জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা (হাইকোর্টের আজকের আদেশ) দেখিয়ে হয়তো তিনি সাবমিট করতে পারবেন। কিন্তু আপিল বিভাগ ফাইনালি ডিসাইড (সিদ্ধান্ত) করবেন।’

আজকের এই আদেশের ফলে বিষয়টি নিয়ে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো কি না— এমন প্রশ্নে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘অবশ্যই। এ জন্যই তো আমরা আপিল বিভাগে যাব।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেকোনো বিচারক তার ভিউ এক্সপ্রেস (মতপ্রকাশ) করতে পারেন। কিন্তু সবার ওপরে আমদের সংবিধান। আমাদের বিচারকরা বিচার করেন সাংবিধানিক বিধি মেনে নিয়ে। আমাদের সংবিধানের স্পষ্টভবে বলা আছে, নৈতিক স্খলনজনিত কারণে দুই বছর বা তার বেশি সাজা হলে ওই ব্যাক্তি নির্বাচন করতে পারবে না। আর ওই সাজা খেটে তিনি মুক্তিলাভ করলেও তাকে পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে। সংবিধান দেশর সর্বোচ্চ আইন। কাজেই এই আইনের পরিপন্থি কোনো আদেশ হলে অবশ্যই আমরা বিষয়টি আপিল বিভাগের দৃষ্টিতে আনব।’

মামলার বিবরণে জানা যায়, মিথ্যা তথ্য, অবৈধ ও জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত ১২ জুলাই ঝিকরগাছা উপজেলার চেয়ারম্যান সাবিরা সুলতানাকে দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ২৬ ও ২৭ ধারায় ৩ বছর করে মোট ৬ বছরের সাজা দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত।

১৭ জুলাই বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে আদালত সাবিরাকে জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠান।

পরে এ সাজার বিরুদ্ধে আপিল করেন সাবিরা সুলতানা। একইসঙ্গে জামিন আবেদন করেন। সে আপিল গত ৩০ জুলাই শুনানির জন্য গ্রহণ করে আদালত। গত ৬ আগস্ট হাইকোর্ট থেকে জামিন হয় সাবিরা সুলতানার।

গত ১৪ অক্টোবর সাবিরা সুলতানা তার সাজা ও দণ্ড স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করলে বিচারপতি মো. শওকত হোসেনের একক বেঞ্চ ওই আবেদনের শুনানি করতে বিব্রতবোধ করে।

তখন নিয়মানুযায়ী আবেদনটি প্রধান বিচারপতির কাছে গেলে প্রধান বিচারপতি আবেদনটি শুনানির জন্য বিচারপতি মো. রইস উদ্দিনের বেঞ্চে পাঠান। এ বেঞ্চে শুনানি শেষে আজ এ আদেশ দেন আদালত।

সারাবাংলা/এজেডকে/এমআই/টিআর

staf.news
admin@news12.us

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *