নিউজ ডেস্কঃ আজ বুঝি আমার জীবনের শেষদিন। বিমানটি দুভাগ হয়ে যাওয়ার পর আগুন লেগে যায়। চোখের সামনেই আমার স্বামীসহ বেশ কয়েকজন মারা যান। এরপর কেউ এসে আমাকে উদ্ধার করেন। আমি বেঁচে থাকবো কখনও ভাবিনি।

কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালার রহমতে আমি বেঁচে আছি’- এমনভাবেই কথাগুলো বলছিলেন নেপালের কাঠমান্ডু ত্রিভুবন বিমানবন্দরে বাংলাদেশের ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আহত ইমরানা কবির হাসি।

ইমরানা কবির হাসি টাঙ্গাইল পৌর এলাকার ২নং ওয়ার্ডের এনায়েতপুর দক্ষিণপাড়ার সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা হুমায়ূন কবিরের মেয়ে। তিনি রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ইমরানা কবির হাসির স্বামী সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী উপজেলার বাগুটিয়া গ্রামের মৃত রবিউল হাসানের ছেলে।

তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। উল্লেখ্য গত বছরের ১২ মার্চ ইমরানা কবির হাসি (২৮) ও তার স্বামী রকিবুল হাসান নেপালে ঘুরতে যাওয়ার সময় তাদের বিমানটি দুর্ঘটনার শিকার হয়। ওইদিন ঘটনাস্থলেই তার স্বামী রকিবুলের মৃত্যু হয়। এসময় বেঁচে যান হাসি। হাসি বেঁচে থাকলেও সেই স্মৃতি তিনি ভুলতে পারছেন না।

দীর্ঘ ১১মাস পর গত ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি টাঙ্গাইলের বাসায় ফেরেন। তার আরও কয়েকটি অপারেশন বাকি রয়েছে। এখনও তিনি ইউএস বাংলার ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসাধীন আছেন । ইমরানা কবির হাসি জানান, গত বছরের ১২ মার্চ দুপুরের দিকে তাদের বহন করা বিমানটি নেপালের উদ্দেশে উড্ডয়ন করে।

ঘণ্টা খানেক যাওয়ার পর একটি পাহাড় দেখে তিনি বুঝতে পারেন তারা নেপাল পৌঁছে গেছেন। কিছুক্ষণ পর অস্বাভাবিক ঝাকুনি লেগে বিমানটি মাটিতে পড়ে যায়। অধিক ঝাকুনি লাগার কারণে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বিমানটি স্বাভাবিকভাবে অবতরণ করেনি।

কোনও কিছু বুঝার আগেই তিনি লক্ষ্য করেন তার স্বামী উল্টে সিটের নীচে পড়ে গেছেন। মুহুর্তের মধ্যেই বিমানটি দুই ভাগ হয়ে যায়। তখন অনেকেই বের হচ্ছিলেন। কিন্তু বাম হাত দিয়ে সিটবেল্ট খোলার চেষ্টা করে তিনি ব্যর্থ হন। এসময় পিছন দিক থেকে আসা আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং বিমানে যারা ছিল তারাও আগুনে পুড়তে থাকে।

ততক্ষণে হাসির শরীরে আগুন লেগে যায়। আগুনে পুড়তে থাকায় নিরুপায় হয়ে তার স্বামীকে ডাকতে থাকেন। কিন্তু তখনও কথা বলছিলো না তার স্বামী রকিবুল। প্রচন্ড আগুন ও অধিক পরিমাণে ধোয়া থাকায় মুখের সামনে ওড়না নিয়ে নিশ্বাস নিচ্ছিলেন হাসি। চোখের সামনেই তার স্বামীসহ বেশ কয়েকজন আগুনে পুড়ে যায়।

তিনি আরও জানান, কিছুক্ষণ পর পানির মতো কিছু বিমানে দেওয়া হচ্ছিলো, তাতে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ফোমের মতো কিছু দেওয়ার ফলে বিমান ও তার শরীরের আগুন নিভে যায়। তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কেউ একজন তার পাশে আছে।

তখন সেভ মি, সেভ মি বলে চিৎকার করার পর ফায়ার সার্ভিস অথবা সেনাবাহিনীর কেউ এসে তাকে উদ্ধার করেন। এসময় তিনি বারবার তার স্বামীকে সেভ করতে বলছিলেন। এরপর তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

এরপর কি হয়েছে তিনি কিছুই জানেন না। ৯দিন পর তার জ্ঞান ফিরে আসে। নেপালে ছয়দিন ও সিঙ্গাপুরে তিনদিন কিভাবে কেটেছে তার কিছুই মনে নেই। একের পর এক অপারেশন, ড্রেসিং তো আছেই। একদিন পর পর দুই-তিন ঘণ্টা ড্রেসিং ছিল খুবই ভয়াবহ। জ্ঞান ফেরার পর স্বামীর কথা জানতে চাইলে নেপালে আছে বলে জানায় তার বাবা।

সে তার স্বামীর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছে একাধিকবার, কিন্তু কেউ তাকে নিয়ে যাননি। আড়াই মাস চিকিৎসা নেওয়ার পর দেশে ও ১১ মাস পর টাঙ্গাইলের বাসায় ফিরেছেন তিনি। এখনও আরও কিছু চিকিৎসা বাকি আছে তার।

ইমরানা কবির হাসি আরও জানান, আল্লাহর রহমতে, মানুষের দোয়ায় ও বাংলাদেশ সরকার এবং ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষের সার্বিক সহযোগিতায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা হয়েছে বিধায় আমি এখনও সুস্থ্য আছি। আইসিইউতে চিকিৎসা নেওয়া অবস্থায়ও আমার চোখে আগুন ভাসতো। শরিরীক চিকিৎসা করতে পারলেও মানসিক চিকিৎসা কেউ করতে পারে না।

পুরোপুরি সুস্থ্য হয়ে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করতে চান। ইমরানা কবির হাসির বাবা হুমায়ূন কবির জানান, গত বছরের ১২ মার্চ তার মেয়ে ও মেয়ের জামাই সাতদিনের ভ্রমণে ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইউএস বাংলার বিমানে করে নেপালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। তাদের বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার পর আমি বাড়ির দিকে রওনা হই। পরে জানতে পারেন হাসিকে বহন করা বিমানটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। খবরটি শোনার পর কিভাবে তিনি টাঙ্গাইল পৌঁছেছেন কিছুই বলতে পারেনি।

টিভির খবরে হাসিকে এক নজর দেখার পর তিনি জ্ঞান হারান। তিনি জানান,অপরদিকে দুর্ঘটনার স্বীকার যাত্রীদের আত্মীয়-স্বজনদের নেপালে নেওয়া হবে এমন সংবাদ পাওয়ার পর তিনি আবার বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। রাত ১২টার দিকে তিনি ইউএস বাংলার অফিসে গিয়ে পৌঁছান।

তার পাসপোর্ট না থাকায় হাসির বান্ধবির জামাইকে নেপালে পাঠানো হয়। নেপাল থেকে হাসিকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হবে এমন খবর পাওয়ার পর হাসির বাবা হুমায়ূন কবির দ্রুত সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট করে ১৫ মার্চ নেপাল গিয়ে পৌঁছান। তারপর সকাল-বিকাল হাসপাতালে গেলেও হাসির সঙ্গে কোনও কথা বলতে পারেনি।

শুধু মৃত দেহের মতো হাসিকে পড়ে থাকতে দেখেছেন। হাসির বাবা আরও বলেন,‘১৬ মার্চ ইউএস বাংলার কর্মকর্তা, বাংলাদেশের মেডিক্যাল টিমসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসির বাবাকে নিয়ে বৈঠক করে হাসিকে সিঙ্গাপুরে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন।

১৭ তারিখ রাত ১২টার ফ্লাইটে হাসিকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়। সঙ্গে হাসির বাবাও ছিলেন। পরদিন হাসিকে সিঙ্গাপুর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তি করার তিন ঘণ্টা পর চিকিৎসকরা হাসির বাবাকে জানান, হাসিকে বাচানো সম্ভব, তবে হাসির বাম হাতের কব্জি পর্যন্ত কেটে ফেলতে হবে। বিষয়টি ওই হাসপাতালের বাংলাদেশি চিকিৎসককে জানানো হলে তিনি দ্রুত ওই ওয়ার্ডে আসেন। ওই চিকিৎসক জানান কব্জি পর্যন্ত কাটতে হবে না হাতের পাঁচটি আঙ্গুল কাটলেই চলবে।

হাসির বাবার অনুমতি নিয়ে চিকিৎসক হাসির পাঁচটি আঙ্গুল কেটে ফেলেন। সেখানে ৯দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর হাসি সুস্থ হয়। হুমায়ন কবির বলেন,‘আমার মেয়ে জীবিত ফিরে আসবে, আমি কখনও কল্পনাও করিনি।

ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষ হাসির চিকিৎসার দায়ভার নেওয়ায় হাসি এখন অনেকটাই সুস্থ আছে। নেপাল ও সিঙ্গাপুরে হাসির কাছে বসে বসে কান্না করেছি এবং দোয়া করেছি এমন বিপদ যেন আর কারও জীবনে না আসে। এতো কষ্টের পরও হাসি বেঁচে থাকায় আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া।’ প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ১২ মার্চ নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের ড্যাশ-৮ কিউ ৮০০ বিমান বিধ্বস্ত হয়। বিমানটিতে চারজন ক্রু ও ৬৭জন যাত্রীসহ মোট ৭১জন আরোহী ছিলেন।

নিউজ১২/নি

staf.news
admin@news12.us