সায়ন্থ সাখাওয়াৎ

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নাকি ১৪ দলের বাকি ১৩টিকে অনবরত নসিহত করে চলেছেন। তিনি চাইছেন এই ১৩-এর যে কজনকে আওয়ামী লীগ সংসদে বসার টিকিট দিয়েছে, তারা যেন বিরোধী দলের আসনে বসেন। ভাবখানা এমন, আমরা শুধু টিকিটই দিইনি, নির্বাচনে জালিয়াতির দায় নিয়ে তোমাদের সংসদেও এনেছি। সুতরাং আমাদের কথা না মানার মতো বেয়াদবি কেন করবে?

কিন্তু এতে চটেছেন মহাজোটের ছোট দলের বড় ও প্রভাবশালী নেতা ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। তিনি ওবায়দুল কাদেরকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, রাশেদ খান মেননের রাজনৈতিক জীবনের তুলনায় ওবায়দুল কাদের শিশু। তার রাজনীতির জন্মের আগে থেকে রাশেদ খান মেনন রাজনীতি করেন। সুতরাং ওবায়দুল কাদের যেন বুঝেশুনে ওয়াজ করেন।

কথা তো সত্য। কমরেড ইনু-মেনন সাহেবরা কী করে বিরোধী দল হবেন? তারা তো এখন নৌকার কমরেড। আগেই নৌকায় চড়ে বসেছেন। এমপি হওয়ার জন্য জনগণের ভোটের দরকার না হলেও একটি মার্কা তো দরকার হয়েছে।

সে মার্কাটা তো ছিল নৌকাই। নৌকার সাইড মাঝি হয়ে নৌকায় বসে নৌকার বিরোধিতা কী করে সম্ভব! যে মাঝির বাঁচা-মরা নৌকায়, তার তো দিনের শুরু নৌকা প্রণাম করে, দিনের শেষও নৌকা বন্দনায়। আর তাকে কি না বলা হচ্ছে উল্টো বৈঠা টানতে!

বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেনন বলেন, ‘ওবায়দুল কাদের সাহেব প্রতিদিন আমাদের উপদেশ দিচ্ছেন। তাদের রাজনীতির জন্মের আগে আমাদের রাজনীতি। তিনি এখন প্রতিদিন আমাদের উপদেশ দিচ্ছেন কী করতে হবে।

… আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষস্থানীয় নেতারা প্রায়ই ১৪ দলীয় জোটের বিপরীতে কথা বলে আসছেন। ১৪ দলকে বিরোধী দলে যাওয়ার জন্য উপদেশ দিচ্ছেন তারা। আমি আশা করি, প্রধানমন্ত্রী সেটা অনুধাবন করবেন এবং জোটকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবেন। আর সেটা না হলে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।’

শুধু জোট ভাঙার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েই থেমে যাননি রাশেদ খান মেনন। নির্বাচনে জালিয়াতির ঐতিহাসিক দায়ও তিনি চাপিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর ওপর।

২০০৬ সালে বিএনপি যে ইট মেরে ছিল এবারের নির্বাচন তার একটা পালটা জবাব, তাই এখন গণতন্ত্রের কথা বলে লাভ নেই উল্লেখ করেই তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘সেই ৮৬ সালে বামরা, আমাদের কমিউনিস্ট পার্টিগুলো শেখ হাসিনার সঙ্গে মিলে নির্বাচন করেনি? সেই নির্বাচনে কী হয়েছিল, তা সবার জানা আছে। এরশাদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে কে কয়টা সিট পাবে, সবই তো ঠিক ছিল সেই সময়।’

স্বৈরশাসক এরশাদের সেই পাতানো নির্বাচনটা এখন কেন তিনি সামনে আনলেন, সেটা হয়তো অনেকের কাছেই স্পষ্ট। এবারের নির্বাচনের রেজাল্টও ছিল পূর্বনির্ধারিত। তবে কমরেড মেননের এই কিঞ্চিৎ স্পষ্টবাদী হয়ে ওঠার পেছনে যে মন্ত্রিত্ব না পাওয়ার বেদনাই প্রধান, তা সবারই জানা।

বঞ্চনা কখনো কখনো মানুষকে কিঞ্চিৎ সত্যবাদী করে তুলে বটে। কিন্তু এই সত্যবাদিতা রাশেদ খান মেননের সততাকে নির্দেশ করে না। কারণ তিনি নিজেও এই জালিয়াতির প্রোডাক্ট হিসেবেই এমপি হয়েছেন।

মহাজোটের আরেক প্রভাবশালী কথক নেতা নাকি মন্ত্রিত্ব না পেয়ে বুকে হাত দিয়ে সিসিইউ পর্যন্ত ছুটে গিয়েছিলেন। তিনি মন্ত্রী থাকাকালে তার অন্যতম দায়িত্ব ছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে গালি দেওয়া। অনেকে মজা করে তাকে বলতেন, সরকারের বিএনপিবিষয়ক মন্ত্রী। কিন্তু মন্ত্রিত্ব না পেয়ে তার মুখে এমন কুলুপ এঁটেছেন, অনেক মানুষ তার কথার বিনোদন থেকে বঞ্চিত হয়ে আছেন।

তবে মহাজোটের আরেক শরিক দল বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ জাতীয় কমিটির সাধারণ সভার যে লিখিত বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে পাঠানো হয়েছে, তা রীতিমতো ভয়ংকর। বিশেষ করে নির্বাচন নিয়ে তাদের বক্তব্য আওয়ামী লীগকে বেকায়দায় ফেলতে না পারলেও অস্বস্তিতে যে ফেলেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

শরীফ নুরুল আম্বিয়া, মঈনুদ্দীন খান বাদল এমপি, নাজমুল হক প্রধান, ডা. মুশতাক হোসেনও যে সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের মতোই এই নির্বাচনকে ‘ভুয়া’ বলেছেন, সেটা কম কথা নয়। তাদের মতে, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের সব রাজনৈতিক দল ও জনগণ উদ্দীপনা ও আশা নিয়ে অংশগ্রহণ করলেও নির্বাচনের পরে বিষণœতায় আক্রান্ত হয়েছে পুরো জাতি।

এর মূল কারণ হচ্ছে, প্রশাসনের এক শ্রেণির অতি-উৎসাহী অংশ ভোটের আগের রাতেই ভুয়া ভোটের মাধ্যমে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখাসহ নানা অনিয়ম সংঘটিত করেছে। এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা নজিরবিহীন। জনগণের ভোটের মাধ্যমে ১৪ দল তথা মহাজোটের নিশ্চিত বিজয় জেনেও যে মহলবিশেষ এ অপকর্ম সংঘটিত করেছে, গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থেই তাদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

কেননা, এই কলঙ্কিত ঘটনার মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। এ কলঙ্কের দাগ মুছতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে।’

১৪ দলীয় জোট প্রসঙ্গেও এ জোট সঙ্গীটি তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে এভাবে, ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক দল যদি ১৪ দলের প্রয়োজনীয়তা অনুভব না করে ১৪ দল ত্যাগও করে, তবুও অন্যান্য শরিক দল ১৪ দলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে। এই বিবৃতির মধ্যেও অসততা আছে। মঈনুদ্দীন খান বাদল এই নির্বাচনে এমপি হয়েছেন। তিনি শপথ না নিলে বা সংসদ থেকে পদত্যাগ করলে বোঝা যেত, তারা কোনো বঞ্চনা থেকে নয়, আদর্শিক অবস্থান থেকেই এই নির্বাচনকে ভুয়া বলেছেন।

আরেকটি বিষয়ও তারা চতুরতার সঙ্গে এড়িয়ে গেছেন। তারা বলেছেন, ‘প্রশাসনের এক শ্রেণির অতি-উৎসাহী অংশ ভোটের আগের রাতেই ভুয়া ভোটের মাধ্যমে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখাসহ নানা অনিয়ম সংঘটিত করেছে।’ যে নির্বাচনের জালিয়াতির ডিজাইনটা পুরো সরকারের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই অনেকে মনে করেন, সেটাকে তারা ঠেলে দিয়েছেন প্রশাসনের কতিপয় অতি-উৎসাহীর ঘাড়ে।

আর এ নির্বাচনে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যেভাবে গায়েবি মামলা, গ্রেপ্তার, প্রার্থিতা বাতিল, প্রার্থীকে গ্রেপ্তার-আক্রমণ করা হয়েছে, তা নিয়েও টুঁ শব্দটি করেনি জাসদ। এ নির্বাচনে সরকার প্রশাসনকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার না করলে যে তাদের কী পরিমাণ ভরাডুবি হতো, তা কারও অজানা নয়।

জনরায়ের প্রতি সরকারি জোটের আস্থার অভাব এতটাই ছিল যে, তারা হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার, প্রার্থিতা বাতিল করে নির্বাচনী মাঠে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করার পরও শুধু ইলেকশনের দিন মানুষকে স্বচ্ছন্দে ভোট দেওয়ার সুযোগটুকু দিতেও সাহস পায়নি।

এত কিছুর পরও জনরায়ে কতটা ভীত হলে একটি সরকারকে দুদিন ধরে এভাবে প্রকাশ্যে ভোট জালিয়াতি করতে হয়! আগের রাতে বাক্স ভরেও তাদের ভয় কাটেনি বলেই পরের দিনও ভুয়া ভোটে বাক্স ভরতে হয়েছে।

এ ধরনের জালিয়াতি করতে তাদের কোনো রকম সংকোচ করতেও দেখা যায়নি। প্রভাবশালী ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট এই নির্বাচনকে বলেছে, একটি স্বচ্ছ জালিয়াতির নির্বাচন। ‘অবিচুয়ারি অব এ ডেমোক্রেসি’ : বাংলাদেশ নিবন্ধে পত্রিকাটি বাংলাদেশের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন নিয়ে লেখে, ‘ফ্রডুলেন্টলি ট্রান্সপারেন্ট ইলেকশন’।

নির্বাচনে এত ব্যাপক মাত্রার জালিয়াতির পেছনে প্রধান কারণ ছিল, আওয়ামী লীগ যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় থাকতে চায়। গত দশ বছর তারা যে লুটপাট, নিপীড়ন, গুম, খুন, হামলা, মামলার জন্ম দিয়েছে, তাতে তারা একদিকে যেমন প্রতিশোধের ভয়ে ভীত, আরেক দিকে আছে লুটপাট অব্যাহত রাখার দুর্নিবার লোভ। এ কারণে যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় থাকার জন্য ব্যাপক জালিয়াতি ভিন্ন অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না আওয়ামী লীগের হাতে। অথচ জাসদ বলে দিল, জনগণের ভোটের মাধ্যমে ১৪ দল তথা মহাজোটের নিশ্চিত বিজয় জেনেও মহলবিশেষ ভুয়া ভোটে আগের রাতে বাক্স ভরার অপকর্মটি করেছে!

যত চতুরতার আশ্রয়ই নিক না কেন, মন্ত্রিত্ব না পাওয়ার বেদনা বা অন্য যেকোনো উদ্দেশ্যেই বলুক না কেন, মহাজোটের অন্তত দুটি প্রধান শরিক দলের কথায় এটা স্পষ্ট যে দেশে গণতন্ত্র নেই এবং এবারের নির্বাচনটি হয়েছে ব্যাপক জালিয়াতিপূর্ণ। পাশাপাশি ১৪ দলীয় জোটের দুটি দলের নেতাদের বক্তব্য ও একটি দলের প্রধান নেতার অভিমানী নীরবতা এ জোটে ভাঙনের ইঙ্গিতই বহন করে। সময়ই বলে দেবে, আওয়ামী লীগ তাদের তুষ্ট করে জালিয়াতির নির্বাচনের সমর্থক অংশীদার করবে নাকি ভেঙে যাবে ১৪ বছরের পুরনো জোট ১৪ দল।

লেখক

চিকিৎসক ও কলামনিস্ট

staf.news
admin@news12.us

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *