বাংলাদেশে হেরেছে মানুষ জিতেছে ইসলাম বিদ্বেষ – মাহমুদুর রহমান

গত শতকে অর্ধ শতাব্দী ব্যাপি শীতল যুদ্ধ কালিন সময়ে বিবাদমান দুই পক্ষের মধ্যে ইসলামী রাষ্ট্রসমূহের সমর্থন আদায় নিয়ে এক প্রকার প্রতিযোগীতা চলতো। এতে করে প্রতিযোগীতার বাজারে মুসলমানরা খানিকটা সুবিধা পেত। ১৯৭৩ সালে সৌদি বাদশাহ্ ফয়সলের নেতৃত্বে পরিচালিত তেল অবরোধ (Oil Embargo) নীতি জায়নবাদী আগ্রাসী ইসরায়েলের অন্ধ সমর্থক পশ্চিমা বিশ্বকে যথেষ্ট অসুবিধায় ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। একই দশকে ইরানে সফল ইসলামী বিপ্লব বৈরী বিশ্বে ইসলামী রেঁনেসার সম্ভাবনা তৈরী করেছিল।



আফগানিস্তানে সোভিয়েট আগ্রাসনের পরাজয় বিশ্বের অধিকাংশ মুসলমানের মধ্যে নতুন করে ধর্মীয় এবং জাতীয়তাবাদী উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল। দূর্ভাগ্যবশত: এই জাগরন ক্ষণস্থায়ী ছিল। সোভিয়েট ইউনিয়নের পতনের পর কট্টর ইসলাম বিদ্বেষী মার্কিন পন্ডিত স্যামুয়েল হান্টিংটনের সমগোত্রীয়রা প্রকাশ্যেই ইসলামকে পশ্চিমাদের অন্যতম শত্রু হিসেবে ঘোষনা দিয়ে মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে ক্রসেডের ডাক দেয়। ক্ষয়িষ্ণু পরাশক্তি রাশিয়া এবং উদীয়মান পরাশক্তি চীনের অবস্থানও নীতিগতভাবে মুসলামানের পক্ষে ছিল না।

চেচেনদের প্রতি রাশিয়া এবং উইঘুরদের প্রতি চীন যে অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে তার সঙ্গে প্যালেস্টাইনের বিরুদ্ধে ইসরায়েল এবং কাশ্মীরে ভারতীয় আচরনের মধ্যে কোন মৌলিক এবং গুনগত ফারাক নেই। বাংলাদেশের পাশে মিয়ানমারে বৌদ্ধরা সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর যে গনহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে তাতেও ভারত এবং চীন উভয়ের সমর্থন রয়েছে। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট উপরোক্ত বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে পর্যালোচনা করা আবশ্যক।



২০০৭ সালে বাংলাদেশে যে ভারতপন্থী সেনা অভ্যুত্থান ঘটানো হয়েছিল তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ঢাকাস্থ জাতিসংঘ অফিসের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে বিজয়ী করবার সকল কৌশল দিল্লিতে বসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালিন প্রধান জেনারেল মইন এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী প্রনব মুখার্জী যিনি পরবর্তীতে দেশটির রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন মিলে ঠিক করেছিলেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ঠিক কোন সময় থেকে ভারতীয় ফাঁদে পা দিয়েছে সেটা আমার মত আমজনতার পক্ষে বলা কঠিন হলেও ২০০৭ থেকে সেনাবাহিনীর অবস্থান নিয়ে জনমনে আর কোন সংশয় নেই। তবে একটি তথ্য এখানে প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

আওয়ামী লীগ পন্থী এবং ভারতীয় দালাল বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী বিএনপিকে ক্যান্টমেন্টে সৃষ্ট দল অভিহিত করে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করলেও আশ্চর্য্যজনক ভাবে স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অধিকাংশ এক নম্বর ব্যক্তিই কিন্তু অবসরের পর আওয়ামী লীগেই যোগ দিয়েছেন। পাঠকের সুবিধার জন্য স্বাধীনতা পরবর্তী কালের সেনা প্রধানদের একটি তালিকা এবং তাদের রাজনৈতিক ভূমিকার অতি সংক্ষিপ্ত বয়ান এখানে উল্লেখ করছি:



১. জেনারেল ওসমানি : আওয়ামী লীগের এম পি এবং মন্ত্রী

২. জেনারেল সফিউল্যাহ : আওয়ামী লীগের এম পি

৩. জেনারেল জিয়া : বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা

৪. জেনারেল খালেদ মোশাররফ : ৭ নভেম্বর, ১৯৭৫ এর সিপাহী বিপ্লবে নিহত। আওয়ামী লীগ এবং ভারত সমর্থক।

৫. জেনারেল এরশাদ : জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং শেখ হাসিনা ও ভারতের অনুগামী।

৬. জেনারেল আতিক : অরাজনৈতিক

৭. জেনারেল নুরুদ্দিন : আওয়ামী লীগের এম পি এবং মন্ত্রী



৮. জেনারেল নাসিম : ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের পক্ষে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে চাকুরীচ্যূত।

৯. জেনারেল মাহবুব : বিএনপির এম পি এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য।

১০. জেনারেল মুস্তাফিজ : আওয়ামী লীগের এম পি এবং মন্ত্রী।

১১. জেনারেল হারুন : অরাজনৈতিক হলেও ঘোরতর আওয়ামী লীগ সমর্থক।

১২. জেনারেল মশহুদ : এক এগারো সেনা অভ্যুত্থানের কুশিলব এবং দুদক চেয়ারম্যান।



১৩. জেনারেল মইন : এক এগারোর ভারতপন্থী সেনা অভ্যুত্থানের নেতা।

১৪. জেনারেল মুবিন : অরাজনৈতিক

১৫. জেনারেল ইকবাল করিম : ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে সহায়তাকারী।

১৬. জেনারেল বেলাল : আওয়ামী লীগ সমর্থক পরিবারভূক্ত এবং সাবেক মেয়র মরহুম আনিসুল হকের

(আওয়ামী লীগপন্থী) আপন ভাই।

১৭. জেনারেল আজীজ : ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের ভোট ডাকাতির নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সহায়তাকারী।



সেনাপ্রধানের চরিত্র এবং সুস্পষ্ট রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শ্রেনি-চরিত্রের দর্পন কিনা আমার জানা নেই। তবে জেনারেলদের আওয়ামী প্রীতির পিছনে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা, ‘র’ (RAW)ি ক্রীয়াশীল থাকছে কি না সেই প্রশ্নটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করি। খানিকটা প্রসঙ্গচ্যুতি ঘটেছিল। শিরোনামের আলোচনায় ফেরা যাক।

২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষমতা প্রাপ্তির অব্যবহিত পর থেকেই সেই সরকারের বিরুদ্ধে তথাকথিত ইসলামী জঙ্গীবাদকে উৎসাহিত করার অপবাদ দেয়া হতে থাকে। তৎকালিন চারদলীয় সরকারকে বিতর্কিত করার এজেন্ডায় ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম, পশ্চিমা বিশ্বের ভারতীয় বংশোদ্ভূত সাংবাদিক এবং বাংলাদেশের ইসলাম বিদ্বেষী, সেক্যুলার মিডিয়া যার যার মত করে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ডংকা বর্তমান ক্ষমতাসীন ফ্যাসিস্ট শাসক এবং তার দেশি-বিদেশী মিত্ররা বাজাচ্ছে তার সূচনা ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে হলেও তখন কিন্তু মিডিয়াতে বিএনপিকে হেয় করতে ব্যর্থ রাষ্ট্র তত্ব চালু করা হয়েছিল।



বেগম খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্বের সর্বশেষ পূর্ণ বছরের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ শতাংশ উন্নীত হলেও অধিকাংশ মিডিয়া সেই সফলতা প্রচারে বিরত থেকেছে। বেগম জিয়া ক্ষমতা থেকে ২০০৬ সালে বিদায় নিয়েছেন। তারপর এক যুগেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও বাংলাদেশ সরকারের দলবাজ সংখ্যাতাত্ত্বিকরা পরিসংখ্যান নিয়ে নানা প্রকার ইঞ্জিনিয়ারিং করেও প্রবৃদ্ধিকে সাতের চেয়ে বাড়াতে পারেননি। বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত পরিসংখ্যানকে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ কিংবা এডিবি কেউই এখন আর বিশ্বাস করতে চায় না।

সরকার ঘোষিত প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের হিসেবের মধ্যে গত এক দশক ধরে সর্বদাই অন্তত এক শতাংশের ফারাক থেকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা সমূহের হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখনও বিএনপি সরকারের ২০০৫-০৬ সালের প্রবৃদ্ধিকে অতিক্রম করেনি। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কথা এবং কাজে যে কোন মিল নেই এ বিষয়টি শেখ হাসিনার ঘনিষ্টতম মিত্ররাও অবগত আছেন। ওয়াশিংটন, লন্ডন এবং ব্রাসেলস্ থেকে বাংলাদেশ সম্পর্কে কুটনৈতিক ভাষায় যে সকল বিবৃতি প্রকাশিত হয় সেগুলো পর্যালোচনা করলে বাংলাদেশ সরকার সম্পর্কে নিম্নোক্ত আন্তর্জাতিক মতামতই ফুটে ওঠে:



১. বাংলাদেশ একটি এক দলীয়, স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিনত হয়েছে।

২. বাংলাদেশে মানবাধিকারের ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। বিচার বহির্ভূত হত্যা এবং গুম খুনের সংখ্যায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বে শীর্ষস্থানীয়। দেশটিতে ভিন্ন মত, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজের কোন স্থান (Space) নেই।

৩. এদেশে বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানকে নজিরবিহীন দলীয়করনের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে।

৪. বাংলাদেশে সকল গনতান্ত্রিক কাঠামোকে উপড়ে ফেলা হয়েছে। জনগনের ভোটাধিকার হরনের মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে তামাশায় পরিনত করা হয়েছে।

৫. বর্তমান সরকারের আমলে লক্ষ্যনীয় অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটেছে।

৬. শেখ হাসিনার সরকার ইসলামী জঙ্গীবাদকে প্রশংসনীয় ভাবে দমন করেছে।



উপরোক্ত তালিকায় আমার কোন ব্যক্তিগত মতামত প্রতিফলিত হয়নি। পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহ, জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমূহের বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে আমি কেবল একটি সংক্ষিপ্তসার তৈরী করেছি। পশ্চিমাদের বক্তব্যের মধ্যেই ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে সমর্থনের কারন বর্ননা করা হয়েছে। বাংলাদেশে কাথিত ইসলামী জঙ্গীবাদ দমনে রাষ্ট্র যন্ত্রের ভয়ংকর নিপীড়নের যে নীতি শেখ হাসিনা নিয়েছেন সেটিই ইসলাম বিদ্বেষী পশ্চিমা শক্তির কাছে তার সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ন যোগ্যতা। আমরা ইসলাম ফোবিয়ায় আক্রান্ত এমন এক বিশ্বে বসবাস করছি যে, ফ্যাসিস্ট সরকারের পুলিশ ও র‌্যাবের পোষাকে Death Squad এর জঙ্গী নিধন গল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে দেশে-বিদেশে কেউ প্রশ্ন তুলছে না।

র‌্যাব-পুলিশের গল্পে একটি Common pattern রয়েছে। কোন অপারেশন শেষে জীবিত কাউকে পাওয়া যায় না। অর্থাৎ পুলিশের একতরফা বয়ানেই আপনাকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। অপরপক্ষ অর্থাৎ কথিত ইসলামী জঙ্গীরা হয় সপরিবারে আত্মহত্যা (!!!) করেছে অথবা দু-পক্ষের গোলা-গুলিতে নিহত হয়েছে। মরা মানুষ তো আর কথা বলতে পারে না। সুইসাইড ভেস্ট বুকে বেঁধে সপরিবারে আত্মহত্যার প্রচারনা যে ডাহা মিথ্যা এটা যে কোন সাধারন জ্ঞান সম্পন্ন মানুষেরই বোঝা উচিৎ।



শ্রীলংকায় হিন্দু তামিল টাইগাররাই সন্ত্রাসী হামলায় সুইসাইড ভেস্টের সবচেয়ে সফল প্রয়োগ করেছে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এই প্রকার হামলাতেই নিহত হয়েছিলেন। যে কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্যরা বোমা বুকে বেঁধে তখনই বিস্ফোরন ঘটায় যখন তারা কোন নির্দিষ্ট টার্গেটকে হত্যা করতে চায় অথবা সর্বোচ্চ সংখ্যক Collateral damage ঘটানোর সম্ভাবনা থাকে। বাংলাদেশ পুলিশ এবং র‌্যাবের আষাঢ়ে গল্প অনুযায়ী বাংলাদেশের ইসলামী জঙ্গীরা নিজের স্ত্রী এবং শিশু সন্তানদের হত্যা করবার জন্যই কেবল বিস্ফোরন ঘটায়। তারা পুলিশ, র‌্যাব কিংবা অন্যান্য বেসামরিক নাগরিকদের কখনও হত্যা করতে চায় না।

বাংলাদেশী জঙ্গীরা তো তাহলে সব মহৎ সন্ত্রাসী! বিশ্বে এমন জঙ্গী কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। র‌্যাব-পুলিশের গল্পে আরো একটি লক্ষ্যনীয় দিক রয়েছে। গত দশ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, যখনই সরকার কোন বিষয়কে কেন্দ্র করে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে ঠিক সেই সময়ই জঙ্গী নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। দেশের জনগন এবং আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতেই একটি কাল্পনিক ঘটনার সৃষ্টি করে কয়েকজন দরিদ্র মানুষকে তাদের স্ত্রী-সন্তানসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশের আওয়ামী এবং ভারতীয় দালাল মিডিয়াতে সেই সব কল্পকাহিনি ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। ঢাকার পশ্চিমা কুটনীতিকবৃন্দ মুসলমান হত্যায় পুলকিত বোধ করেছেন। ছয় মাসের শিশুর ছিন্ন ভিন্ন লাশ কুড়িয়ে কোন এক গনকবরে ফেলে মাটি চাপা দেয়া হয়েছে।



তাতে কুটনীতিকরা মোটেও বিচলিত বোধ করেন নি। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এমনটা হয়েই থাকে। বরঞ্চ মুসলিম শিশু হত্যা করতে পারায় ওই সকল কুটনীতিকদের কাছে শেখ হাসিনার গ্রহনযোগ্যতা বেড়ে গেছে। ইরাক এবং আফগানিস্তানে পশ্চিমা জোট তো আর কম শিশু হত্যা করেনি। প্যালেস্টাইন, কাশ্মীর এবং মিয়ানমারে শিশু হত্যার হিসাব আর কে রাখতে যাচ্ছে? Collateral damage এর নামে নির্বিচারে মানুষ হত্যা তো খোদ জাতিসংঘই মেনে নিয়েছে। ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে আলেমদের গনহত্যার ঘটনা বিশ্বের তাবৎ ইসলাম বিদ্বেষীর কাছে শেখ হাসিনাকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একজন নরী হওয়া সত্ত্বেও নৃশংসতায় তিনি সকল পুরুষ ডিক্টেটরদের ছাড়িয়ে গেছেন। মুসলিম বিশ্বে এমন গনহত্যাকারী শাসককেই তো হান্টিংটনের শিষ্যরা পছন্দ করেন। বাংলাদেশের নব্য ফ্যাসিবাদ ইসলাম বিদ্বেষকে পুঁজি করেই বিকশিত হয়েছে। ইজিপ্টের সিসি যে কারনে পশ্চিমা বিশ্বে সমাদৃত, সেই একই কারনে শেখ হাসিনা তাদের কাছে অপরিহার্য।



এক চরম বৈরী পরিস্থিতিতে ৩০ ডিসেম্বরের এক তরফা নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশগ্রহনের সিদ্ধান্ত নেয়। ইসলামের গন্ধ দূর করে ইন্দো-মার্কিন লবির কাছে গ্রহনযোগ্যতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত দলটি সেক্যুলার ড: কামাল হোসেনের নেতৃত্ব পর্যন্ত মেনে নেয়। তাতে আদর্শচ্যুতি ঘটলেও রাজনৈতিক কোন ফায়দা হয়নি। যে ইন্দো-মার্কিন লবি তাদেরকে নির্বাচনে অংশগ্রহনে উৎসাহিত করেছে তারা শেখ হাসিনার বিকল্প হিসেবে ড: কামালকে কোনদিন বিবেচনা করেনি। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনাকে এক প্রকার বৈধতা প্রদান। শেখ হাসিনার প্রচন্ড অহমিকার ফলে মার্কিনীরা হয়ত খানিকটা বিব্রত হয়েছে। ঐক্যফ্রন্টকে ছাড় দিয়ে শেখ হাসিনা প্রধান বিরোধী দল বানাতে সম্মত হলে মার্কিনীদের জন্য একটা রিহ রিহ পরিস্থিতি তৈরী হত।



গোটা চল্লিশেক আসন ভিক্ষা পেলে বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা শপথ নেয়ার পক্ষে যুক্তি খাড়া করতে পারতেন। দলটির মহাসচিব এতদিনে হয়ত সংসদে বিরোধী দলের নেতাও হয়ে যেতেন। কিন্তু, ফ্যাসিবাদের ধর্মই হচ্ছে সকল ক্ষমতা কুক্ষীগত করা। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেন্বারলেইন যথাসম্ভব ছাড় দিয়েও হিটলারকে সন্তুষ্ট করতে পারেননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমেই হিটলারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হয়েছিল। শেখ হাসিনাও হিটলারেরই এক অতি ক্ষুদ্র সংস্করন। ক্ষমতাচ্যূতি ব্যতীত তার কাছ থেকে বাংলাদেশের জনগনের মুক্তি সম্ভব নয়। এতদিন ভারত তার নিকটতম মিত্র ছিল। পশ্চিমারা ভারতকে সন্তুষ্ট করতে এবং ইসলাম ফোবিয়ার কারনে শেখ হাসিনাকে সমর্থন জোগাতো। ২০১৪ সালের পর থেকে চীনও তার মিত্রে পরিনত হয়েছে।

চীনা নেতৃত্ব শুধু সমর্থন দিয়ই ক্ষান্ত থাকছে না, তারা শেখ হাসিনাকে অধিকতর স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দিকে উৎসাহিত করছে। সে দেশের সরকারী পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে শেখ হাসিনাকে সংসদীয় গনতন্ত্র এবং বহুদলীয় পদ্ধতির নেতিবাচক দিক সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। চীনের এই অবস্থান হয়ত মার্কিন মিত্রদের অস্বস্তির কারন হতে পারে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বৈরতন্ত্র প্রকাশ্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করলে গনতান্ত্রিক পশ্চিমা বিশ্বে প্রশাসন চাইলেও সে সব দেশের জনগনের কাছে বাংলাদেশী মহিলা সাদ্দামের পক্ষে ওকালতি করা কঠিন হতে পারে।



স্বৈরতান্ত্রিক সেক্যুলার হাসিনা সরকারের প্রতি চীন এবং ভারত প্রতিযোগীমূলক ভাবে বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করলেও, পশ্চিমারা খানিকটা দ্বিধান্বিত বলেই মনে হচ্ছে। মিয়ানমারে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের উপর পরিচালিত গনহত্যা নিয়ে মার্কিনীদের সাথে চীনের যে মতবিরোধ রয়েছে সেটি বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে আরো বিস্তৃত হতে পারে। হান্টিংটনের তত্ব অনুযায়ী কেবল ইসলাম নয়, চীনও পশ্চিমা সভ্যতার শত্রু। অতএব চীনের সঙ্গে শেখ হাসিনার এতটিা মাখামাখি ওয়াশিংটনের মাথাব্যথার কারন হতে পারে। একমাত্র ইসলাম ফোবিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারতকে বাংলাদেশ সরকারের নীতির প্রশ্নে এক কাতারে নিয়ে আসে কিনা সেটি দেখার জন্য আমাদের কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

সম্পাদক, দৈনিক আমার দেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *