বিএনপির ৩২৭ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

গত বছর লালমনিরহাটে বিজয় দিবসের র‌্যালি কেন্দ্র করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সংঘর্ষ হয়। ওই সংঘর্ষে পুলিশ সদস্য আহতের ঘটনায় বিএনপির ৩২৭ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।

বৃহস্পতিবার লালমনিরহাটের অতিরিক্ত চিপ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান মণ্ডল এ আদেশ দেন।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, গত বছর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের র‌্যালিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মাঝে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

এ সময় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আসামিদের ছোড়া ইটপাটকলের আঘাতে তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ-সার্কেল) সুশান্ত সরকার, সদর থানার ওসি মাহফুজ আলম, এসআই আলমগীর হোসেন এবং দুজন কনস্টবল আহত হন।

পর দিন এ ঘটনায় বিএনপির ২৮ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও চার শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেন সদর থানার এসআই আলমগীর হোসেন।

মামলাটি দীর্ঘ তদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার ৪১৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সদর থানার এসআই মাইনুল হক।

এ মামলার প্রধান আসামি সদর উপজেলার বড়বাড়ির বাসিন্দা হারুন মিয়া তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অপর একটি মামলায় ঢাকা কারাগারে রয়েছেন বলে জানা গেছে। আর আসলাম নামে আরও একজন আসামি লালমনিরহাট কারাগারে রয়েছেন।

বৃহস্পতিবার পুলিশের দাখিল করা ওই অভিযোগপত্র পর্যালোচনা করে লালমনিরহাট অতিরিক্ত চিপ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মেহেদী হাসান মণ্ডল ৩২৭ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

এ বিষয়ে লালমনিরহাট কোর্টের ওসি জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের জানান, আদালত এ মামলায় ৩২৭ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন। আসামিদের ঠিকানা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট থানায় আদালতের আদেশনামা পাঠানো হচ্ছে।

লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান বাবলা যুগান্তরকে বলেন, ২০১৭ সালের বিজয় দিবস উপলক্ষে বিএনপির বের করা র‌্যালিতে শাসক দলের লোকজন হামলা করেছিল। এর পরও পুলিশ বিএনপির ২৮ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে মামলা করেন।

তবে এখন দেখছি-পুলিশ শুধু সদর উপজেলার নয়- গোটা জেলার সবকটি উপজেলার বিএনপির প্রায় ৪১৯ নেতাকর্মীর নামে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছেন।

আগামী নির্বাচনে লালমনিরহাটে বিএনপির নেতাকর্মীদের শূন্য করতে পুলিশ এমন চার্জশিট দাখিল করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

প্রার্থিতা ফিরে পেলেন বিএনপির অন্তত ৩১ জন:

রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের প্রথম দিনের শুনানিতে ১৬০ জনের মধ্যে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন ৮০ জন। তাদের মধ্যে অন্তত ৩১ জনই বিএনপির নেতা।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের ভবনে হয় এই শুনানি। প্রার্থিতা বাতিল হওয়া প্রার্থীরা আইনজীবী নিয়ে এসে শুনানি করেন।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার দলের বেশ কয়েকজনের প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, সঠিকভাবে আপিল নিষ্পত্তি হলে তার দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও প্রার্থী হতে পারবেন।

শুনানিতে প্রার্থীদের পক্ষে দেওয়া বক্তব্য শোনেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাসহ পাঁচ কমিশনার। ছিলেন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদও। ছিলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা।

এই শুনানি শুরু হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের শামসুল হুদাকে দিয়ে। গত রবিবার প্রার্থিতা যাচাই-বাছাইয়ে সারা দেশে বাদ পড়ে যান ৭৮৬ জন। তাদের মধ্যে বিএনপিরই ছিলেন ১৪১ জন। তাদের প্রায় সবাই এবং সব মিলিয়ে ৫৪৩ জন করেন আপিল। তিন দিনে এসব আবেদনের শুনানি শেষ করা হবে।
শুনানিতে আপিল করা প্রার্থী এবং তার বিপক্ষে বক্তব্য রাখার সুযোগ রাখা হয়। বাতিল হয়ে যাওয়া প্রার্থীর আইনজীবীরা বক্তব্য রাখার পর এর বিরুদ্ধে কেউ বলতে চাইলে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিপক্ষে বলার কেউ ছিল না।

প্রথম দিন শুনানি শেষে যে আদেশ এসেছে, তা বিএনপির জন্য স্বস্তিকর হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ে দল বা জোটের প্রার্থী ছিল না ছয়টি আসনে। এর মধ্যে বগুড়া-৭, ঢাকা-১, মানিকগঞ্জ-২ ও জামালপুর-৪ আসনে একজন করে বৈধ প্রার্থী নিশ্চিত হয়েছে প্রথম দিনের শুনানিতে।

বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বগুড়া-৭ আসনে বিএনপির তিনজন প্রার্থীর মনোনয়নই বাতিল হয়ে গিয়েছিল গত রবিবার। তবে সেখানে মোরশেদ মিল্টনকে বৈধ প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে।

ঢাকা-১ আসনে বিএনপির মনোনয়নের চিঠি পাওয়ার পর বাতিল হওয়া দুই প্রার্থীর মধ্যে খন্দকার আবু আশফাকের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা হয়েছে আপিলে।

জামালপুর-৪ আসনে বিএনপির একমাত্র প্রার্থী ফরিদুল কবির তালুকদার শামীমের মনোনয়ন বাতিল করে দিয়েছিলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। সেখানে বিএনপির আর কোনো প্রার্থী ছিল না। ফরিদুলকে নির্বাচন কমিশন বৈধ প্রার্থী ঘোষণা করায় স্বস্তি ফিরেছে বিএনপিতে।

একই পরিস্থিতি মানিকগঞ্জ-২ আসনে। সেখানে মনোনয়নের চিঠি পাওয়া দুজনের প্রার্থিতা রিটার্নিং কর্মকর্তা বাতিল করে দেন। তবে আপিল করে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন আবিদুর রহমান খান।

এর বাইরে পঞ্চগড়-২ আসনে ফরহাদ হোসেন, কুড়িগ্রাম-৩ আসনে আব্দুল খালেক, রাজশাহী-১ আসনে আমিনুল হক, জয়পুরহাট-১ আসনে ফজলুর রহমান, পাবনা-৩ আসনে হাসাদুল ইসলাম, সিরাজগঞ্জ-৩ আসনে আইনুল হক ও নাটোর-৪ আসনে আবদুল আজিজ প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।

ঝিনাইদহ-২ আসনে প্রার্থী আব্দুল মজিদ, খুলনা-৬ আসনে এস এম শফিকুল আলম এবং পটুয়াখালী-৩ আসনে গোলাম মাওলা রনি ও মোহাম্মদ শাহজাহান এখন বৈধ প্রার্থী।

ঢাকা-৫ আসনে সেলিম ভূঁইয়া, ঢাকা-১৪ আসনে সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক, ঢাকা-২০ আসনে তমিজ উদ্দিন, কিশোরগঞ্জ-২ আসনে আখতারুজ্জামান রঞ্জন, মানিকগঞ্জ-১ আসনে তোজাম্মেল হক তোজা, মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আতাউর রহমান আতা বৈধ প্রার্থী ঘোষণা হয়েছেন।
ময়মনসিংহ-৭ আসনে জয়নাল আবেদীন, শেরপুর-২ আসনে এ কে এম মুখলেছুর রহমান রিপনও ভোটে অংশ নিতে পারবেন।

সিলেট-৩ আসনে আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, হবিগঞ্জ-২ আসনে জাকির হোসেন; ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে আবু আসিফ আহমেদ, কুমিল্লা-৩ আসনে এ কে এম মুজিবুল হক, কুমিল্লা-৫ আসনে মো. ইউনুছ, নোয়াখালী-৪ আসনে শাহীনুর সাগর, চট্টগ্রাম-১ আসনে নূরুল আমিন এবং চট্টগ্রাম-৩ আসনে মোস্তফা কামাল পাশা বৈধ প্রার্থী ঘোষিত হয়েছেন।
বিএনপির জোট ২০ দলের শরিক এলডিপির নেয়ামুল বশিরের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা হয়েছে চাঁদপুর-৫ আসনে। বিএনপির আরেক জোট ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরামের মাহফুজার রহমানের মনোনয়ন বৈধ হয়েছে কুড়িগ্রাম-৪ আসনে।

প্রার্থিতা ফিরে পাওয়া বিএনপি নেতারা উৎফুল্ল:

হলফনামায় সই না করায় পটুয়াখালী-৩ আসনে মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল গোলাম মাওলা রনির। আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের আচরণে আমি সন্তুষ্ট। তাদের প্রতিটি জিনিসই আমার পছন্দ হয়েছে। শুধু আমিই নয়, আজকে যারা এসেছে তারা সবাই সন্তুষ্ট ইসির প্রতি।’

বিএনপির ডাকসাইটে প্রার্থী যারা আপিলেও বাদ:

বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যে রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, ওয়াদুদ ভুঁইয়া, আবদুল ওহাব, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মীর নাছির উদ্দিনের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।
এদের মধ্যে দুলু প্রত্যাশিত আদেশ না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আমিও দমছি না। এর শেষ দেখে ছাড়ব, আমি উচ্চ আদালতে যাব।’

চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে প্রার্থিতা ফিরে না পেয়ে দলের ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বলেন, ‘এখানে তামাশা করা হচ্ছে। তাদের সিদ্ধান্ত পূর্বনির্ধারিত। আমারটা একেবারে রিজেক্ট করে দিয়েছে। পেন্ডিং রাখলেও তো হতো। আগেই ভেবেছিলাম, এখানে এসে সঠিক বিচার পাওয়া যাবে না। বাইরে থেকে লোকদের ঢাকায় ডেকে এনে তামাশা মঞ্চস্থ করছে ইসি।

বিএনপির যেসব প্রার্থীর আবেদন মঞ্জুর হয়নি

খাগড়াছড়ি আসনের আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, পঞ্চগড়-১ আসনের মো. তৌহিদুল ইসলাম, বগুড়া-৩ আসনের মো. আব্দুল মুহিত, বগুড়া-৬ আসনে একেএম মাহবুবুর রহমান, হবিগঞ্জ-২ আসনের মো. জাকির হোসেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের আখতার হোসেন, ফেনী-১ আসনের মো. নূর আহাম্মদ মজুমদার, লালমনিরহাট-২ আসনের মো. জাহাঙ্গীর আলম, রংপুর-৫ আসনের মমতাজ হোসেন, চট্টগ্রাম-৫ আসনের মীর মোহাম্মদ নাসির, নীলফামারী-৪ আসনের মো. আমজাদ হোসেন, নীলফামারী-৩ আসনের ফাহমিদ ফয়সাল চৌধুরী, সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের সাইফুল ইসলাম শিশির, বাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনের মুশফিকুর রহমান, নাটোর-২ আসনের রুহুল কুদ্দুস তালুকদার, বগুড়া-৭ আসনের মোহাম্মদ সরকার বাদল, সিরাজগঞ্জ-২ আসনের ইকবাল হাসান মাহমুদ, নওগাঁ-৫ আসনের মোহাম্মদ নাজমুল হক, যশোর-২ আসনের সাবিরা নুর ও মাগুরা-২ আসনের খন্দকার মেহেদী আল মাসুম।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় নির্বাচন কমিশনের অস্থায়ী এজলাসে এ শুনানি শুরু হয়। দু’দফা বিরতিসহ চলে সাড়ে পাঁচটা পর্যপ্ত। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, মো. রফিকুল ইসলাম, বেগম কবিতা খানম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী এ আপিল শুনানি করছেন। আপিল শুনানি পরিচালনা করেন ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে পূনরায় শুনানি শুরু হবে। ক্রমিক নম্বর ১৬১ থেকে ৩১০ পর্যন্ত শুনানি গ্রহণ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *