বিএনপির একক প্রার্থী ঘোষণা স্থগিত তিন কারণে

যেসব আসনে বিএনপির একক প্রার্থী চূড়ান্ত হয়েছে সেই তালিকা প্রকাশের কথা ছিল বৃহস্পতিবার রাতে। কিন্তু আচমকা সেই তালিকা প্রকাশ স্থগিত করা হল।

এ নিয়ে বিএনপির মনোনয়নের টিকিট হাতে পাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা কানাঘুষা।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বৃহস্পতিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন যে, আজ (বৃহস্পতিবার) রাত ৮টার দিকে বিএনপির একক প্রার্থীদের আংশিক তালিকা প্রকাশ করা হবে। জানিয়ে দেয়া হবে কে কোন আসন থেকে ধানের শীষের প্রতীকে নির্বাচন করবেন।

বিএনপির প্রার্থীরা অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন কখন প্রার্থী তালিকা আসবে। গণমাধ্যমকর্মীরা সেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন।

কিন্তু সন্ধ্যার পর বিএনপির কার্যালয় থেকে জানানো হয়-প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে না। বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইং কর্মকর্তা শায়রুল কবির দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমকে জানান, অনিবার্য কারণবশত প্রার্থীদের তালিকা ঘোষণা স্থগিত করা হয়েছে।

সেই ‘অনিবার্য কারণ’টি কী, সেটি নিয়ে চলছে বিস্তর আলোচনা। এর সুলোক সন্ধানে চলছে হাজারো চেষ্টা।

বিএনপি ও তাদের দুই জোটের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত একক প্রার্থী ঘোষণায় বিএনপির পিছু হটার পেছনে অন্তত তিনটি কারণ ও যুক্তি রয়েছে-

প্রথমত অনেকের প্রার্থিতা বাতিলের আপিল শেষ না হওয়া;

দ্বিতীয়ত দুই জোটের শরিকদের সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতা না হওয়া;

তৃতীয়ত বিএনপি একক প্রার্থী ঘোষণায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের আপত্তি।

জানা গেছে, মনোনয়ন প্রত্যাহারের বাকি আর মাত্র দুদিন। এখনও প্রায় সব আসনে বিএনপি ও জোটের একাধিক নেতার মনোনয়নপত্র জমা দেয়া আছে। এ নিয়ে প্রার্থীরা ঘোর অমানিশায় আছেন। নির্বাচনে তিন সপ্তাহ আগেও প্রার্থীরা জানেন না তারা নির্বাচন করতে পারবেন কী পারবেন না।

বিষয়টি অনুধাবন করে বিএনপির প্রস্তুতি ছিল ১৫০ আসনে একক প্রার্থী ঘোষণার। তারা সেই তালিকাও চূড়ান্ত করে রেখেছিল। কিন্তু জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের আপত্তি এবং উপরোল্লিখিত কারণগুলো সামনে রেখে তারা চূড়ান্ত তালিকা ঘোষণা থেকে পিছু হটে।

মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে প্রার্থিতা ফিরে পেতে ৬-৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনে আপিলের শুনানি । শুনানিতে প্রথম দিনে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন ৮০ প্রার্থী। এর মধ্যে বিএনপির ৩৯ জন।

প্রার্থিতা ফিরে পেতে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেন ৫৪৩ প্রার্থী। এখনও ৩৮৩ প্রার্থীর শুনানি বাকি। আজ ও কাল প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার আপিল হবে। সেখানে আরও অনেকেই প্রার্থিতা ফিরে পাবেন।

এ মুহূর্তে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হলে অপেক্ষমাণরা বঞ্চিত হতে পারেন। বিষয়টি মাথায় রেখে বিএনপি প্রার্থী তালিকা প্রকাশ থেকে পিছু হটে।

বিএনপির নেতৃত্বে দুটি রাজনৈতিক জোট এবার নির্বাচন করছে। এতে দল আছে ২৭টি। এই দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির আসন বণ্টন চূড়ান্ত হয়নি। দফায় দফায় বৈঠক চলছে। কিন্তু চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।

দুই জোটের সঙ্গে আসন বণ্টনের রফা নিয়ে পৃথক দরকষাকষি করতে হচ্ছে বিএনপিকে। একজোটের শরিকদের সঙ্গে একটি সমঝোতা হয় তো অন্য জোট বেঁকে বসে।

এমতাবস্থায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আসনে ফয়সালা করতে আজও বসবে ফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটি।

তাই বিএনপির প্রতি দুই জোটের চাপ আছে আসন বণ্টনের চূড়ান্ত রফা না হওয়া পর্যন্ত যেন দলের প্রার্থী ঘোষণা না করা হয়।

এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনের পর সন্ধ্যায় মতিঝিলে ড. কামাল হোসেনের চেম্বারে যান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সেই বৈঠকে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা বিএনপির প্রার্থী ঘোষণা স্থগিত করতে মির্জা ফখরুলকে অনুরোধ করেন।

তাদের যুক্তি হচ্ছে-এককভাবে বিএনপি প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করলে জোটের অনৈক্য প্রকাশ পাবে। এতে তৃণমূলে ভুল বার্তা যাবে।

ঐক্যফ্রন্টের এক শীর্ষ নেতা জানান, বৃহস্পতিবারের বৈঠকে আংশিকভাবে বিএনপিকে প্রার্থী ঘোষণার ব্যাপারটি ভেবে দেখতে বলা হয়। উপস্থিত নেতারা বিএনপি মহাসচিবকে আংশিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা না করে একবারে করা যায় কিনা, তা বিবেচনার জন্য বলেন। ঐক্যফ্রন্টের প্রায় সব আসনের চূড়ান্ত প্রার্থীদের ঘোষণা একবারে করার অনুরোধও করা হয়।

বৈঠকে মির্জা ফখরুল যেসব আসনে জোটের প্রার্থী নেই, সেই তালিকা প্রকাশ করার যুক্তি তুলে ধরেন। তার যুক্তি ছিল- জোটের সঙ্গে সমস্যা হবেন, এমন আসনগুলোর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করতে তো কোনো বাধা নেই। কিন্তু তাতে আপত্তি জানান গণফোরামসহ বৈঠকে উপস্থিত নেতারা।

মির্জা ফখরুল তার ‍যুক্তিতে অটল থেকে ফের বলেন, দলে প্রার্থীদের মধ্যে এখনও নানা অনিশ্চয়তা কাজ করছে। তারা মনোনয়নের নিশ্চয়তা চাচ্ছেন। দলের কার্যালয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতাদের ব্যাপক চাপ। অনেকে এলাকায় না গিয়ে মনোনয়ন ছুটে যাওয়ার আশঙ্কায় ঢাকায় অবস্থান করছেন। এভাবে নির্বাচনী প্রস্তুতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই যেসব আসন নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে কোনো সমস্যা হবে না, শরিক দলের প্রার্থী নেই; অন্তত সেই আসনগুলোর তালিকা প্রকাশ করতে চান তিনি।

কিন্তু গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, এতে ফ্রন্টে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হবে। আংশিক তালিকা প্রকাশ না করে পুরো তালিকা একসঙ্গে প্রকাশ করাই ভালো হবে। অধিকাংশ নেতা তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন। এর পর আজ শুক্রবার বেলা ৩টায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কার্যালয় থেকে প্রার্থী তালিকা ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

বৈঠক থেকে বেরিয়ে মির্জা ফখরুল দলের দু-তিনজন সিনিয়র নেতার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে মির্জা ফখরুল আংশিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *